Loading...

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশন
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মধ্যে নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ।’


বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার মধ্যে নিউইয়র্কে চলছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ।’
এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২ জুন তিনি এই পদে নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের কোনো কূটনীতিকের জন্য এটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তেমনি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঢাকার দৃশ্যমানতাও বাড়িয়েছে। অধিবেশনের উদ্বোধনী বক্তব্যে খলিলুর রহমান জাতিসংঘের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন, কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমঝোতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সাধারণ বিতর্কে তার বক্তব্যেও উঠে এসেছে গাজা, ইউক্রেন, সুদান ও মিয়ানমারের যুদ্ধ এবং বাস্তুচ্যুতি। তিনি উল্লেখ করেছেন, বিশ্ববাসীর প্রশ্ন এখন জাতিসংঘ আছে কি না, সেটি নয়; বরং প্রতিষ্ঠানটি কার্যকরভাবে কাজ করছে কি না। একই সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘের কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৮১তম অধিবেশনে ২৬ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর তিনি সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন।
ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।

এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে জটিল ভূরাজনৈতিক ইস্যুগুলোর একটি মধ্যপ্রাচ্য। গাজায় যুদ্ধ, পশ্চিম তীরে সহিংসতা ও বসতি সম্প্রসারণ এবং অঞ্চলজুড়ে সামরিক উত্তেজনা বিশ্বনেতাদের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে।
সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। তিনি যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত এবং উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন।
গাজা সংকটকে কেন্দ্র করে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রশ্নও আবার সামনে এসেছে। একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে গুতেরেস বলেছেন, ১৯৬৭-পূর্ববর্তী সীমারেখার ভিত্তিতে স্বাধীন ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের স্বীকৃত আন্তর্জাতিক কাঠামো। তার ভাষায়, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে ক্রমেই সংকুচিত করছে।
ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অংশগ্রহণ নিয়েও সাধারণ পরিষদে ভোট হয়েছে। ১৭ সেপ্টেম্বর ১৫২টি দেশের সমর্থনে গৃহীত প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে পূর্বধারণকৃত ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও প্যারাগুয়ে প্রস্তাবটির বিপক্ষে ভোট দেয়।
ফলে এবারের সাধারণ পরিষদ শুধু আনুষ্ঠানিক ভাষণের মঞ্চ নয়। বাংলাদেশের জন্য এটি রোহিঙ্গা, জলবায়ু ন্যায়বিচার ও আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব তুলে ধরার সুযোগ; আর মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক সহায়তা এবং দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরির ক্ষেত্র।
৮১তম অধিবেশনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি সম্ভবত এখানেই: যুদ্ধ থামানো বা রাজনৈতিক সমাধান চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সাধারণ পরিষদের নেই, কিন্তু বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র কোন নীতির পক্ষে দাঁড়াচ্ছে, তার রাজনৈতিক মানচিত্র এই মঞ্চেই স্পষ্ট হয়। আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা ফল দেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬