Loading...

অবহেলার অভিযোগ ও রোগীর নিরাপত্তা
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় স্বজনদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সময়মতো চিকিৎসা, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসকের উপস্থিতি। এই উদ্বেগের পাশাপাশি আলোচনায় চিকিৎসায় আস্থার সংকটের অর্থনৈতিক মাত্রাও। খাতসংশ্লিষ্টদের অনুমান, বিদেশে চিকিৎসায় বাংলাদেশিদের বছরে ব্যয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।


সিলেটে এক নবজাতকের মৃত্যু ঘিরে অবহেলার অভিযোগ দেশের চিকিৎসায় রোগীর নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় স্বজনদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে সময়মতো চিকিৎসা, রোগনির্ণয় ও চিকিৎসকের উপস্থিতি।
এই উদ্বেগের পাশাপাশি আলোচনায় চিকিৎসায় আস্থার সংকটের অর্থনৈতিক মাত্রাও। খাতসংশ্লিষ্টদের অনুমান, বিদেশে চিকিৎসায় বাংলাদেশিদের বছরে ব্যয় প্রায় ৫০০ কোটি ডলার।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সিলেটের মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে প্রসবের সময় নবজাতকের মৃত্যুর পর স্বজনেরা চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, অস্ত্রোপচারের অনুরোধ সত্ত্বেও স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করা হয়। শিশুর মাথা বের হওয়ার পর কাঁধ আটকে যায়। টানাটানিতে মাথা, গলা ও পিঠে আঘাত লাগে। পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে ডাকা হলেও ততক্ষণে শিশুটি মারা যায় বলে অভিযোগ পরিবারের।
হাসপাতালের ব্যবস্থাপক শফিক আহমদ অবশ্য অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তর বক্তব্য, জন্মের আগেই শিশুটি মারা গিয়েছিল। বের করার সময় শরীরে আঘাত লাগে। তিনি ফরেনসিক পরীক্ষা ও আইনি পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
এর আগে সেপ্টেম্বরে সিলেটের জৈন্তাপুরের দি জৈন্তা সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি প্রসূতি ফারহানা আক্তারের মৃত্যু ঘিরেও ছিল অবহেলার অভিযোগ। পরিবারের ভাষ্য, স্বাভাবিক প্রসবের আশ্বাসের পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে সিলেটে পাঠানো হয়। পথে তার মৃত্যু হয়; পরে নবজাতকও মারা যায়। ১৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে পরিবার ঘটনার তদন্ত ও দায় নির্ধারণের দাবি জানায়।

গত ১ অক্টোবর বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সাত মাসের মাহমুদুল হাসানের মৃত্যুর পরও অবহেলার অভিযোগ ওঠে। শিশুর বাবার দাবি, শ্বাসকষ্ট বাড়লেও চিকিৎসকদের পাওয়া যায়নি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মনিরুল হক খান অবহেলার অভিযোগ মানেননি এবং খোঁজ নেওয়ার কথা বলেছেন। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের সেবা নিয়েই এভাবে প্রশ্ন উঠছে।
ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ অক্টোবর সাড়ে চার বছরের আভানের মৃত্যুর ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। পরিবার রোগনির্ণয়, চিকিৎসকের অনুপস্থিতি এবং চিকিৎসার নথি পেতে অসহযোগিতার অভিযোগ করেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবহেলার দায় অস্বীকার করে জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। এসব অভিযোগকে তদন্তের ফল ছাড়াই প্রমাণিত ভুল চিকিৎসা বলা যায় না।
তবে কিছু ঘটনায় তদন্তে গাফিলতি মিলেছে। এপ্রিলে ফেনীর ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে প্রসূতি নাঈমা আক্তার লিজার মৃত্যুর ঘটনায় জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্তে চিকিৎসা প্রটোকল, অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি উঠে আসে। তদন্ত কমিটির প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণ হলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১ মার্চ অবহেলা ও অপেশাদার আচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ১০ চিকিৎসকের নিবন্ধন ছয় মাস থেকে দুই বছরের জন্য স্থগিত হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নোয়াখালীতে মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তিন চিকিৎসক ও এক স্বাস্থ্য সহকারীর নিবন্ধনও সাময়িক স্থগিত করা হয়। এগুলো নির্দিষ্ট ঘটনায় নেওয়া ব্যবস্থা, দেশব্যাপী অবহেলার মোট সংখ্যা নয়।

এই সংকটের সঙ্গে বিদেশমুখিতার সম্পর্ক নিয়ে ২০২৫ সালে একটি আলোচনা সভায় ইউনাইটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মালিক তালহা ইসমাইল বারী বিদেশে চিকিৎসায় বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার ব্যয়ের কথা জানান। রোগনির্ণয় নিয়ে সন্দেহ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং মানসম্মত সেবার অভাবকে বিদেশে যাওয়ার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। অঙ্কটি খাতসংশ্লিষ্টদের অনুমান।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসার জন্য ব্যাংকিং মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো অর্থ ২০২১–২২ অর্থবছরের ৩৪ লাখ ডলার থেকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৭ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। চার বছরে বৃদ্ধি প্রায় ১০ গুণ। তবে এটি ব্যাংকিং মাধ্যমে পাঠানো অর্থের হিসাব; বিদেশে চিকিৎসার সব ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
বিদেশে চিকিৎসার সঙ্গে রোগী ও সঙ্গীর যাতায়াত, থাকা এবং খাবারের ব্যয়ও যুক্ত হয়। দেশে সেবার ওপর আস্থা কমলে বিকল্প খোঁজার চাপ বাড়ে; তবে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রযুক্তির প্রয়োজনও বিদেশমুখিতার কারণ। চিকিৎসক-রোগীর আচরণগত সম্পর্ক, প্রাথমিক সেবা ও সামগ্রিক ব্যবস্থা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা।
রোগীর নিরাপত্তা, মৃত্যুর ব্যাখ্যা এবং অভিযোগের প্রতিকার তাই হাসপাতালের ভেতরের বিষয়েই সীমিত নেই। ঢাকা চেম্বারের আলোচনায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মানসম্মত সেবার প্রয়োজন উঠে এসেছে। আস্থা ফেরানোর এই কাজ কার্যকর হলে রোগীর বিদেশে বিকল্প খোঁজার চাপ এবং মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬