Loading...

শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক আন্দোলন
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১৪ শিক্ষক প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে বন্ধ ক্লাস ও পরীক্ষা। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অপসারণের দাবিতে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর সোমবার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দাবিগুলো এক নয়; কোথাও প্রশাসনিক কাঠামো, কোথাও নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, কোথাও শিক্ষকসংকট। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে—সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত আসার আগে শিক্ষার্থীদের কতটা সময় হারাতে হচ্ছে?


সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ১৪ শিক্ষক প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে বন্ধ ক্লাস ও পরীক্ষা। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য অপসারণের দাবিতে কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর সোমবার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দাবিগুলো এক নয়; কোথাও প্রশাসনিক কাঠামো, কোথাও নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত, কোথাও শিক্ষকসংকট। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে—সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত আসার আগে শিক্ষার্থীদের কতটা সময় হারাতে হচ্ছে?
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ইনস্টিটিউট হিসেবে নেওয়ার দাবি করছেন। কলেজটির একাডেমিক কার্যক্রম এরই মধ্যে শাবিপ্রবির অধীন; তাদের দাবি মূলত প্রশাসনিক কাঠামোও সেখানে নেওয়ার। রবিবার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে প্রশাসনিক ভবনের ভেতরে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ ১৪ শিক্ষক আটকা পড়েন। সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অবরোধ চলছিল। খাবার পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হচ্ছে না বলে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কিন্তু দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বের হতে দেবেন না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
সোমবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে তাদের প্রতিনিধিদল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আলোচনা করলেও সমাধান হয়নি। এর মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে বদলি করে নতুন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, কোনো ব্যক্তির বদলি তাদের আন্দোলনের বিষয় নয়। সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর কাঠামো পর্যালোচনায় আগে কমিটি হয়েছিল; শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইনস্টিটিউট করার সুপারিশের পরও প্রক্রিয়াটি এগোয়নি। ফলে একটি দীর্ঘদিনের নীতিগত দাবির মুখে তাৎক্ষণিক পদায়নের সিদ্ধান্ত কাজে আসেনি।

সিলেটের আরেক প্রতিষ্ঠান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য মো. আলিমুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একাংশ আন্দোলন করেছেন। নিয়োগ, কেনাকাটা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন তারা। যদিও আলিমুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রশাসনিক ভবনে তালা পড়লেও ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তখন নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা চলছিল। সোমবারও আন্দোলন হয়। পরে বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মুহাম্মদ সফি উল্যাহ মজুমদারকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেয়। নিয়োগের পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
চুয়েটে সংকটের উৎস উল্টো। সেখানে আগের উপাচার্যকে ফিরিয়ে চান আন্দোলনকারীরা। নিয়োগের ৫৬ দিনের মাথায় অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে ২১ সেপ্টেম্বর শেখ শরীফুল আলমকে উপাচার্য করে সরকার। কেন এত দ্রুত পরিবর্তন, তার প্রকাশ্য ব্যাখ্যা চেয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের শাটডাউন এবং পরে শিক্ষক সমিতির কর্মবিরতিতে ক্লাস বন্ধ রয়েছে। ছয়টি বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে। নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নিলেও অচলাবস্থা কাটেনি। চুয়েটের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে বলেছেন, আগের উপাচার্যকে সরানোর কারণ থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতেও উপাচার্য নিয়োগ ঘিরে রবিবার শিক্ষার্থীদের একাংশ সায়েন্সল্যাবে সড়ক অবরোধ করেন। তাদের দাবির সঙ্গে আটকে থাকা পরীক্ষা, একাডেমিক স্থানান্তর ও প্রশাসনিক ভবনের প্রশ্নও ছিল। তবে সোমবার আরেকটি সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ নতুন উপাচার্য লুৎফর রহমানকে স্বাগত জানিয়ে দ্রুত পরীক্ষা ও ফল প্রকাশসহ সাত দফা দাবি জানিয়েছে। এই পরিবর্তন দেখায়, নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ কমলেও একাডেমিক সমস্যাগুলোর সমাধান আলাদাভাবে করতে হবে।

শিক্ষকসংকটের প্রভাবও আন্দোলনে দেখা যাচ্ছে। ১৫ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৬ শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে উপাচার্যকে প্রায় আট ঘণ্টা অবরুদ্ধ রাখেন। তাদের দাবি, বিভাগে মাত্র তিনজন শিক্ষক থাকায় নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষা ব্যাহত হচ্ছিল। স্থানীয় সংসদ সদস্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে বিষয়টি তোলার আশ্বাস দিলে অবরোধ প্রত্যাহার হয়।
তাহলে সরকার কেন দ্রুত সংকট মেটাতে পারছে না? সব ঘটনার জন্য একটি কারণ পাওয়া যায় না। সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের দাবি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক কাঠামোর সিদ্ধান্ত প্রয়োজন; চুয়েটে সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে; গোপালগঞ্জে প্রয়োজন শিক্ষক নিয়োগ। সোমবার সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দিয়ে সরকার পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত, তার কারণ এবং বাকি কাজের সময়সূচি স্পষ্ট না হলে আন্দোলনকারীদের অনিশ্চয়তা থেকে যায়—ঘটনাগুলো থেকে এমন ধারণা পাওয়া যায়।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে বলেছেন, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে একাডেমিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক দক্ষতা মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ বাছাইপ্রক্রিয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দাবি করেছেন, উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি; সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ পেলে তদন্ত হবে।
শিক্ষাকে সরকার কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার জবাব তাই ঘোষণার পাশাপাশি এসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক ক্লাস-পরীক্ষা ফিরিয়ে আনার কাজেও মিলবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬