Loading...

সরবরাহ নিয়ে প্রশ্ন
২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারের একটি পরিকল্পনায় অর্থবছরে ৩৩টি স্পট কার্গো কেনার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর স্পট কেনাকাটা দ্রুত বেড়ে যায়। এপ্রিলের জন্য নয়টি কার্গোর মধ্যে আটটিই স্পট বাজার থেকে কেনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন একটি স্পট কার্গোর গড় দাম ছিল প্রায় ২২ ডলার, যা যুদ্ধের আগে ৯–১০ ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।


বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি কম নয়। কাতার ও ওমানের সঙ্গে পুরোনো চুক্তি রয়েছে, ২০২৬ সাল থেকে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি, আর গত আগস্টে মার্কিন প্রতিষ্ঠান গানভরের সঙ্গে ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১১৭টি কার্গো সরবরাহের নতুন দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাও অনুমোদন করেছে সরকার। তারপরও চলতি বছর গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশকে বারবার স্পট বাজারে ছুটতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম প্রায় ৩০ ডলারে উঠে যাওয়ায় সেই নির্ভরতা এখন শুধু সরবরাহের নয়, বড় আর্থিক ঝুঁকিতেও পরিণত হয়েছে।
১৫ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত দুই কার্গোর একটির দাম ছিল প্রতি এমএমবিটিইউ ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার এবং অন্যটির ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার। একটি সাধারণ কার্গোতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ গ্যাস থাকে। ফলে ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার দরের একটি কার্গোর মূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলারের কার্গো প্রায় ১ হাজার ২৩০ কোটি টাকা। যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ সাধারণত ১০–১২ ডলারের আশপাশে স্পট এলএনজি কিনত; সেই তুলনায় একই পরিমাণ কার্গোর জন্য কয়েক শ কোটি টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলো থাকা সত্ত্বেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো কেন?
এর প্রথম কারণ কাতারের সরবরাহে বড় ধাক্কা। বাংলাদেশ কাতার এনার্জির সঙ্গে দুটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বছরে প্রায় ৪৩ লাখ টন এলএনজি পাওয়ার কথা। ২০২৫ সালে কাতার বাংলাদেশে ৪ দশমিক ১৫ মিলিয়ন টন এলএনজি সরবরাহ করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থায় কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হয়। জুলাইয়ে পেট্রোবাংলা জানায়, ২০২৬ সালের জন্য বাংলাদেশের নির্ধারিত কাতারি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। সংঘাত শুরুর পর বাংলাদেশ ৩৫টি স্পট কার্গো আমদানি করেছিল কাতারের ঘাটতি সামাল দিতে।
এখানে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে। চুক্তিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ সরবরাহের কথা থাকলেও যুদ্ধ, বন্দর বা পরিবহনপথের বড় ধরনের বিঘ্নের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী ‘ফোর্স মাজর’ ঘোষণা করতে পারে। কাতারও এমন পরিস্থিতিতে সরবরাহ কমিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ কাগজে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণে স্পট বাজারে যেতে বাধ্য হয়েছে। কাতার তাদের অন্য এশীয় ক্রেতাদের সরবরাহ ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৩টি এলএনজি কার্গো কিনেও ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে—অর্থাৎ সংকটটি শুধু বাংলাদেশের নয়, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বাস্তব সরবরাহ-নির্ভরতা নিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
দ্বিতীয় দুর্বলতা বাংলাদেশের নিজস্ব অবকাঠামোতে। বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এক্সিলারেটের টার্মিনালের সক্ষমতা প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিটেরটি প্রায় ৫০০–৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট; দুই টার্মিনাল মিলিয়ে তাত্ত্বিক সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি দীর্ঘ সময় পুরো সক্ষমতায় কাজ করতে পারেনি। একপর্যায়ে সেখান থেকে প্রায় ৪৫০–৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯ আগস্ট টার্মিনালটি আবার এলএনজি ফুরিয়ে পুরোপুরি বন্ধও হয়ে যায়।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, বাংলাদেশের হাতে শুধু সরবরাহকারী কম নয়, আমদানি করা গ্যাস গ্রহণ ও পুনঃগ্যাসীকরণের ক্ষেত্রেও বিকল্প খুব সীমিত। দুই টার্মিনালের একটিতে সমস্যা হলেই জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে গিয়েছিল প্রায় ২ হাজার ১৫২ মিলিয়ন ঘনফুটে, যেখানে সরকারি চাহিদা ছিল প্রায় ৩ হাজার ৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট।
তৃতীয় সমস্যা চাহিদার সঙ্গে দেশীয় উৎপাদনের ব্যবধান। আগস্টে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ছিল প্রায় ১ হাজার ৬৩০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেপ্টেম্বরে সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও এর মধ্যে আমদানি করা এলএনজি ছিল প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ বিদ্যুৎ, শিল্প, সার, পরিবহন ও বাসাবাড়ির চাহিদা মেটাতে দেশীয় উৎপাদন ও এলএনজি—দুই উৎসের ওপরই চাপ রয়েছে।
এই ঘাটতির মধ্যে স্পট বাজার কার্যত বাংলাদেশের ‘তাৎক্ষণিক সমাধান’ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে সরকারের একটি পরিকল্পনায় অর্থবছরে ৩৩টি স্পট কার্গো কেনার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালে কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর স্পট কেনাকাটা দ্রুত বেড়ে যায়। এপ্রিলের জন্য নয়টি কার্গোর মধ্যে আটটিই স্পট বাজার থেকে কেনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন একটি স্পট কার্গোর গড় দাম ছিল প্রায় ২২ ডলার, যা যুদ্ধের আগে ৯–১০ ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি উৎস বৈচিত্র্যও বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গানভরের সঙ্গে নতুন ১১৭ কার্গোর চুক্তিতে ২০২৬–২০২৮ সালের ১৪টি কার্গোর দাম জাপান–কোরিয়া মার্কার বা জেকেএম সূচকের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত টোটালএনার্জির কাছ থেকেও মাসে দুটি করে কার্গো নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ নতুন করে ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীনসহ বিকল্প উৎসের কথাও বিবেচনা করছে।
তবু নতুন চুক্তি করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি কাটবে না। কারণ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি মূলত দাম ও নির্দিষ্ট সরবরাহের কাঠামো দেয়; গ্যাস দেশের উপকূলে পৌঁছানো, টার্মিনালে খালাস, পুনঃগ্যাসীকরণ এবং জাতীয় গ্রিডে পাঠানোর সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে, সরবরাহকারী একটি দেশ সমস্যায় পড়লে অথবা একটি এফএসআরইউ বন্ধ হলে পুরো ব্যবস্থায় চাপ পড়ে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬