Loading...

পুলিশের জীবনের মূল্য কোথায়?
এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছরের জুনে সিরাজগঞ্জে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনকালে ট্রাকচাপায় নিহত হন ট্রাফিক পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক নুরুল ইসলাম। ফেব্রুয়ারিতে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত এএসআই আতিকুর রহমান হাসপাতালে মারা যান।


ছিনতাইকারী ধরতে ছুটেছিলেন পুলিশ কনস্টেবল আল আমিন সরদার। চট্টগ্রামের একটি তল্লাশিচৌকিতে দায়িত্ব পালনের সময় ছিনতাইকারী ধরতে গিয়ে বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন তিনি। এক দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সোমবার হাসপাতালে মারা যান। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তার এই আত্মত্যাগ।
এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি বছরের জুনে সিরাজগঞ্জে যানবাহন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনকালে ট্রাকচাপায় নিহত হন ট্রাফিক পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক নুরুল ইসলাম। ফেব্রুয়ারিতে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাকের ধাক্কায় গুরুতর আহত এএসআই আতিকুর রহমান হাসপাতালে মারা যান। একই মাসে কিশোরগঞ্জে পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম।
কখনো মৃত্যু আসে সরাসরি সন্ত্রাসী হামলায়। গত সেপ্টেম্বরে সাভারে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন পুলিশের বিশেষ শাখার এসআই মো. আলতাফ হোসেন। তাঁকে রড, পাইপ, হাতুড়ি ও লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছিল। পরে পুলিশের মহাপরিদর্শক তাঁর আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক পাওয়ার যোগ্য বলে মন্তব্য করেন।
২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলায় জিম্মিদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলি ও বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছিলেন বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন খান এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম।
পরিসংখ্যান বলছে, সর্বোচ্চ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে পুলিশ। পুলিশ সদর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনকালে ২০১৭ সালে ১৩০, ২০১৮ সালে ১৩০, ২০১৯ সালে ১৭৯, ২০২০ সালে ২০৮, ২০২১ সালে ১৩৮ এবং ২০২২ সালে ১২১ পুলিশ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। ছয় বছরে সংখ্যাটি ৯০৬। ২০২৩ সালে কর্তব্যরত অবস্থায় মারা যান আরও ১৩৪ সদস্য। ফলে সাত বছরে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৪০।

মৃত্যুর বাইরেও রয়েছে আহত হওয়ার বড় হিসাব। পুলিশ সদর দপ্তরের মাসিক অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলায় আহত হয়েছেন ৬০১ পুলিশ সদস্য। আসামি গ্রেপ্তার, মাদকবিরোধী অভিযান, সংঘর্ষ থামানো এবং জনরোষ নিয়ন্ত্রণের সময় এসব হামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে আরও অন্তত ৩৬১ সদস্য হামলায় আহত হয়েছেন।
বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে প্রতিবছর ১ মার্চ ‘পুলিশ মেমোরিয়াল ডে’ পালিত হচ্ছে। নিহত সদস্যদের স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা, সশস্ত্র সালাম এবং স্বজনদের হাতে স্মারক, অর্থ ও উপহার দেওয়া হয়। পুলিশ কল্যাণ তহবিল, ক্ষতিপূরণ, পেনশন ও পরিবার সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এই স্বীকৃতি কতটা জাতীয় এবং কতটা দৃশ্যমান। বিদেশি শান্তিরক্ষা মিশন কিংবা সীমান্তে কোনো বাহিনীর সদস্য প্রাণ হারালে তাঁর আত্মত্যাগ জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়। কিন্তু থানার অভিযানে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কিংবা জনতার হামলায় কোনো পুলিশ সদস্য মারা গেলে ঘটনাটি প্রায়ই সংক্ষিপ্ত সংবাদ ও বাহিনীর অভ্যন্তরীণ স্মরণ অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানি, ঘুষ, নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কোনো সদস্যের অন্যায়ের দায় পুরো বাহিনীর ওপর চাপিয়ে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন দেওয়া সদস্যের আত্মত্যাগ অস্বীকার করাও ন্যায়সংগত নয়।
দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যু ও আহত হওয়ার কারণভিত্তিক বার্ষিক প্রতিবেদন, দ্রুত ক্ষতিপূরণ, সন্তানদের শিক্ষা এবং পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সীমান্তে দাঁড়িয়ে জীবন দেওয়া যেমন দেশের জন্য আত্মত্যাগ, তেমনি শহরের মোড়ে যানবাহন থামাতে কিংবা আসামি ধরতে গিয়ে জীবন দেওয়াও দেশের জন্যই। পুলিশের ভুলের বিচার হতে হবে, কিন্তু তাঁদের আত্মত্যাগ ও মূল্যায়িত হতে হবে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায় ।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬