Loading...

হরমুজ থেকে রিয়াদ
ইরানের ৭ দিনের প্রস্তাব, পারমাণবিক কর্মসূচিতে অনড় তেহরান; সৌদি–হুতি সংঘাত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোটে বাড়ছে চাপ। আর এই চাপ জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য, পারমাণবিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সামরিক জোট এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইকে জিইয়ে রাখতে চাইছে।


জল গড়িয়েছে অনেক দূর; মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন আর শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। কারণ, হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ইয়েমেনের হুতিদের হামলা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি নতুন এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের দিকে এগোচ্ছে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন একসঙ্গে দুটি বিপরীত পথে এগোচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করতে সাত দিনের একটি রূপরেখা দিয়েছে ইরান। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরব নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করছে তুরস্ক, পাকিস্তান ও ফ্রান্সের সহায়তায়। একই সময়ে ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তুরস্ক।
সব মিলিয়ে অঞ্চলে এখন কূটনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা এবং নতুন সামরিক বিন্যাস পাশাপাশি চলছে।
ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব, অপেক্ষা যুক্তরাষ্ট্রের জবাবের
সংঘাত বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সাত দিনের একটি রূপরেখা দিয়েছে ইরান। কাতারের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নির্ধারিত শর্তগুলো মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত থামানোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরুর কথাও রয়েছে।
তবে শনিবার পর্যন্ত ইরান আনুষ্ঠানিক মার্কিন জবাবের অপেক্ষায় ছিল। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানানো হলেও তেহরান বলেছে, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত পায়নি। ফলে আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইরান একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, সম্ভাব্য সমঝোতা হলেও পারমাণবিক কর্মসূচির ক্ষেত্রে নিজেদের মূল অবস্থান থেকে সরে যাবে না। অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এবং পারমাণবিক বিরোধ এখন একই আলোচনার অংশ হলেও দুটির সমাধান এক নয়।
হরমুজ ঘিরে চাপ বাড়ছে জ্বালানি বাজারে
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। এখানকার জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিকল্প জ্বালানি পরিবহন পথের গুরুত্ব বেড়েছে।
সৌদি আরব এখন লোহিত সাগরমুখী ইয়ানবু বন্দর ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এই পথ দিয়ে তেল রপ্তানি সচল রাখার চেষ্টা করছে রিয়াদ। সাম্প্রতিক হামলার পর ইয়ানবুর নিরাপত্তা তাই শুধু সৌদি আরবের বিষয় নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
এ অবস্থায় ইয়ানবু রক্ষায় সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স। সেনাসদস্যের পাশাপাশি রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে প্যারিসের। ফরাসি পক্ষ জানিয়েছে, এই মোতায়েনের উদ্দেশ্য বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামোর সুরক্ষা, সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়া নয়।
রিয়াদের দিকে হুতিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইয়েমেনের হুতিরা।
শনিবার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং দুটি ড্রোন আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খামিস মুশাইতের দিকে এবং ড্রোন দুটি রাজধানী রিয়াদের দিকে যাচ্ছিল।
এর আগের দিনগুলোতেও সৌদি ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। ফলে সংঘাতটি ইয়েমেনের ভেতরের লড়াই থেকে বেরিয়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য সরাসরি ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
সৌদির পাশে তুরস্ক ও পাকিস্তান
হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরব এখন মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সমন্বয় বাড়াচ্ছে। তিন দেশের সামরিক নেতৃত্ব সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য যৌথ সহযোগিতা নিয়ে জরুরি আলোচনা করছে। এই ব্যবস্থার মূল নীতি হচ্ছে, সদস্য কোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা।
তবে তুরস্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখনো পুরোপুরি কার্যকর সামরিক জোটে রূপ নেয়নি। চুক্তিটি দেশটির পার্লামেন্টের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে আপাতত আঙ্কারার সহযোগিতা মূলত সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার দিকে কেন্দ্রীভূত। আর এখানেই নতুন একটি ভূরাজনৈতিক ইঙ্গিত দিয়েছে তুরস্ক।
দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার নুমান কুরতুলমুশ বলেছেন, এই প্রতিরক্ষা কাঠামো কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বিস্তৃত হতে পারে। এমনকি ইরানকেও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
অর্থাৎ সৌদি আরব যে প্রতিরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে বর্তমানে হুতি হামলা মোকাবিলায় সহযোগিতা চাইছে, সেটিকে সরাসরি ইরানবিরোধী সামরিক জোট হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে না আঙ্কারা।
ইরাকেও বদলাচ্ছে তুরস্কের সামরিক অবস্থান
একই সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে উত্তর ইরাকে। কৌশলগত বাশিকা-জিলকান সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ পর্যায়ক্রমে ইরাক সরকারের কাছে হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে তুরস্ক। তবে তুর্কি সেনা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট সময় এখনো নির্ধারিত হয়নি।
দুই দেশ সিনজার এলাকায় ইরাকি রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বাড়ানো এবং বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও সহযোগিতা জোরদারের কথা জানিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ালেও অন্যদিকে ইরাকে নিজেদের সামরিক উপস্থিতির একটি অংশ পুনর্বিন্যাস করছে আঙ্কারা।
একই সঙ্গে যুদ্ধ ও সমঝোতার চেষ্টা
ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। একই সময়ে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরব সামরিক প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। রিয়াদের পাশে তুরস্ক ও পাকিস্তান নতুন প্রতিরক্ষা সমন্বয় গড়ে তুলছে, আর গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি অবকাঠামোর সুরক্ষায় সরাসরি যুক্ত হচ্ছে ফ্রান্স।
ফলে এখন সংঘাতের কেন্দ্র শুধু যুদ্ধক্ষেত্র নয়। হরমুজের নৌপথ, ইয়ানবুর তেল অবকাঠামো, রিয়াদের আকাশ প্রতিরক্ষা এবং নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা কাঠামো একই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ওয়াশিংটন ইরানের সাত দিনের প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কী জবাব দেয় এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হুতি হামলা কোন দিকে যায়। কারণ এই দুই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে অঞ্চলটি কূটনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোবে, নাকি আরও বিস্তৃত সামরিক সংঘাতের দিকে যাবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত একে অপরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। হরমুজে নৌ চলাচল ব্যাহত হলে তেলের বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। আর এই চাপ জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক বাণিজ্য, পারমাণবিক কূটনীতি, আঞ্চলিক সামরিক জোট এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইকে জিইয়ে রাখতে চাইছে।
নবোদয়/ কেএ/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬