Loading...

খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি
রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত অপরাধী চক্রের তৎপরতা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় উদ্বেগের একটি ক্ষেত্র। সরকারি হিসাবে দেশে ২৩৭টি গ্যাং; খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্রের মহড়ায় জড়িত সদস্যরা।


কখনো চাপাতি হাতে ছিনতাই, কখনো চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, অপহরণ কিংবা প্রতিপক্ষকে কুপিয়ে হত্যা। কোথাও আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের ভিডিও ছড়িয়ে শক্তির প্রদর্শন।
রাজধানী ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, নোয়াখালী ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত অপরাধী চক্রের তৎপরতা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় উদ্বেগের একটি ক্ষেত্র।
তবে দেশে বর্তমানে ঠিক কতটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়, তার হালনাগাদ একক সরকারি হিসাব নেই। ২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে সারাদেশে প্রায় ২৩৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য ছিল। এর মধ্যে ঢাকায় ১২৭টি এবং চট্টগ্রামে ৫৭টি গ্যাংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে একই সময়ের কাছাকাছি পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক হিসাবে ১৮০টি গ্যাংয়ে অন্তত ১ হাজার ৬৭৭ সক্রিয় সদস্যের তথ্য পাওয়া যায়। এই পার্থক্যই দেখায়, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাং ও সদস্যদের একটি নিয়মিত হালনাগাদ তালিকা এখনো নেই।

গ্রেপ্তার হাজার ছাড়িয়েছে
এসআরবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের শুরু পর্যন্ত কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ৩৩১ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। শুধু ২০২৩ সালেই গ্রেপ্তার হয়েছিল ৩৪৯ জন। এরপরও অভিযান থামেনি। ২০২৫ সালের শুরুতে পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানানো হয়, আগের পাঁচ মাসে সারাদেশে প্রায় এক হাজার কিশোর-তরুণ অপরাধীচক্রের সদস্যকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়েও বড় অভিযান হয়েছে। চলতি বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার ১৮ থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। পুলিশ অবশ্য তাদের সবাইকে গ্যাং সদস্য বলেনি; যাচাই শেষে অপরাধে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
নোয়াখালীর মাইজদীতে ‘কেপিজি’ নামে একটি গ্যাংয়ের ১৮ সদস্যকে আটক করা হয়, যাদের ১৭ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। নারায়ণগঞ্জে কথিত এক গ্যাং নেতাসহ চারজনকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করা হয়। রাজধানীর পল্লবী, মোহাম্মদপুর, আদাবর ও তেজগাঁও এলাকাতেও নিয়মিত অভিযানে গ্যাং সদস্য ও ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার হয়েছে।
অপরাধের ধরন বদলেছে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংগুলোর অপরাধ আর শুধু পাড়া-মহল্লার মারামারিতে সীমাবদ্ধ নেই। তাদের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বিক্রি, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জমি দখল, অস্ত্রের মহড়া, নারী ও কিশোরীদের উত্ত্যক্ত করা এবং হত্যাকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।
কোনো কোনো গ্যাং স্থানীয় প্রভাবশালী বা বড় অপরাধী চক্রের হয়ে কাজ করছে বলেও পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্যাং সদস্যরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দল গঠন, প্রতিপক্ষকে হুমকি এবং নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছে।
চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ রয়েছে। কুমিল্লায় গত কয়েক বছরে অস্ত্রের মহড়া, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন গ্যাংয়ের নাম এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় অন্তত ১২টি হত্যায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের নাম পাওয়া গেছে।

নাম ‘কিশোর’, সদস্যদের সবাই কিশোর নয়
অপরাধের এই চিত্রে আরেকটি বড় অসংগতি রয়েছে। আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের ব্যক্তিরা শিশু। কিন্তু বিভিন্ন অভিযানে ‘কিশোর গ্যাং’ নেতা বা সদস্য হিসেবে ২০, ২৫, ৩০ এমনকি ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষায় ‘কিশোর গ্যাং’ অনেক ক্ষেত্রেই শুধু বয়সভিত্তিক দল নয়; বরং স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা এক ধরনের সংগঠিত অপরাধীচক্রের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ ও অপরাধবিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং তৈরি ও টিকে থাকার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারে নজরদারির ঘাটতি, মাদক, দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকর্ষণ, স্থানীয় আধিপত্যের ইচ্ছা, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা।
অপরাধবিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হকের মতে, শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করলে স্থায়ী সমাধান হবে না। যারা তাদের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা আর্থিক স্বার্থে ব্যবহার করে, সেই পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে একটি গ্যাং ভাঙলেও অন্য নামে নতুন দল তৈরি হবে।
পুলিশ কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান কঠিন। কিশোরদের অনেকে গ্রেপ্তারের পর মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজকে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।

বড় প্রশ্ন পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো, সেই সংখ্যা দিয়ে কিশোর গ্যাং দমনের সাফল্য মাপা কঠিন। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কতটি গ্যাংয়ের নেটওয়ার্ক ভাঙা গেল, অস্ত্র ও মাদকের উৎস বন্ধ করা গেল কি না, তাদের পেছনের প্রাপ্তবয়স্ক নেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের কতজন ধরা পড়লেন এবং গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরদের কতজন আবার অপরাধে ফিরছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, কিশোর গ্যাং এখন আর শুধু ‘বখে যাওয়া কিশোরদের দল’ নয়। কোনো কোনো এলাকায় এটি মাদক, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় সংগঠিত অপরাধের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে পুলিশি অভিযানের পাশাপাশি পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, হালনাগাদ গ্যাং তালিকা তৈরি এবং ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান কঠিন।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬