Loading...

ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে প্রায় অদৃশ্য থাকা একটি নাম হঠাৎ কেন আবার ভয় দেখানোর ভাষা হয়ে উঠল? সত্যিই কি পুরোনো কোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় হচ্ছে, নাকি ‘সর্বহারা’ নামটিই ব্যবহার করছে অন্য কেউ? রাবির ঘটনায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।


নীরবতার দীর্ঘ পর্ব পেরিয়ে আবারও আলোচনায় ‘সর্বহারা’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকসহ সাতজনকে ফোন করে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে এই পরিচয়ে। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপটে প্রায় অদৃশ্য থাকা একটি নাম হঠাৎ কেন আবার ভয় দেখানোর ভাষা হয়ে উঠল? সত্যিই কি পুরোনো কোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় হচ্ছে, নাকি ‘সর্বহারা’ নামটিই ব্যবহার করছে অন্য কেউ? রাবির ঘটনায় সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষক এবং রাজশাহীর একজন চিকিৎসক ও একজন প্রকৌশলীকে ‘সর্বহারা পার্টির’ পরিচয়ে ফোন করে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনায় কারাবন্দী সদস্যদের জামিনের খরচের কথা বলে টাকা চাওয়া হয় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
টাকা না দিলে তাদের ও পরিবারের সদস্যদের ক্ষতির হুমকি দেওয়া হয়। ঘটনাটি নিয়ে নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
ঘটনার একটি দিক বিশেষভাবে কৌতূহল তৈরি করেছে। হুমকি দেওয়া ব্যক্তি নিজেকে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সদস্য এবং সিরাজ শিকদারের ছোট ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন জানিয়েছেন।
প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানে ফোনটি মাদারীপুর এলাকা থেকে করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে যে ব্যক্তির নামে সিমটি নিবন্ধিত, তিনিই ফোনটি করেছেন কি না, কিংবা কলদাতার সঙ্গে কোনো সংগঠনের বাস্তব সাংগঠনিক সম্পর্ক আছে কি না—এসব এখনো তদন্তের বিষয়।
যে নামের জন্ম যুদ্ধের সময়
‘সর্বহারা’ নামটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের জুনে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির যাত্রা শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা সংগঠনটি স্বাধীনতার পর প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে বিপ্লবী রাজনীতির পথ নেয়। পরে সংগঠনটি দীর্ঘদিন গোপন বা আন্ডারগ্রাউন্ড কাঠামোর মধ্যেই সক্রিয় ছিল।
কিন্তু সিরাজ শিকদারের মৃত্যুর পর সংগঠনটির ওপর নেমে আসে বড় ধাক্কা। সময়ের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিভাজন, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের মধ্যে এর বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ‘সর্বহারা’ নামে একটি একক, দৃশ্যমান ও ব্যাপক গণভিত্তিসম্পন্ন রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি আর আগের মতো দেখা যায়নি।
গোপন সংগঠন হওয়ায় এ নিয়ে প্রকাশ্য তথ্যের মধ্যেও দীর্ঘদিন নানা অস্পষ্টতা ছিল। অর্থাৎ, ‘সর্বহারা’ হারিয়ে যায়নি ইতিহাস থেকে; কিন্তু মূলধারার রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে তার দৃশ্যমান উপস্থিতি অনেকটাই সরে গিয়েছিল।

এতদিন পর আবার নামটি কেন?
সাম্প্রতিক কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনায় সেই পুরোনো নাম আবার সামনে এসেছে। এর অর্থ এই নয় যে সংগঠনটি নতুন করে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। বরং ঘটনাগুলো একটি প্রশ্ন তৈরি করছে—কে বা কারা এই পরিচয় ব্যবহার করছে?
কারণ, অতীতেও ‘সর্বহারা’ নাম ব্যবহার করে প্রচারপত্র বা পতাকা প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কখনো কখনো প্রকৃত সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। ফলে শুধু পরিচয় বা ফোনে দেওয়া দাবির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে পুরোনো সংগঠনের সদস্য কিংবা ঘটনাটিকে সংগঠনের প্রত্যাবর্তন হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
রাবির ঘটনাতেও একই সতর্কতা জরুরি। পাঁচ শিক্ষককে একই ধরনের ফোন করা এবং চাঁদা দাবির বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে একটি সংগঠন দীর্ঘ বিরতির পর সাংগঠনিকভাবে ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে নেই।
রাজনীতির জায়গায় কি ভয় দেখানোর ভাষা?
‘সর্বহারা’র ঐতিহাসিক রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান ঘটনাটির পার্থক্য এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট। একসময় এই নামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মসূচি, রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য এবং গোপন সাংগঠনিক কাঠামো। এখন যে ঘটনাটি সামনে এসেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ফোন, ভয় দেখানো এবং অর্থ দাবি।
তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ‘সর্বহারা ফিরল কি না’ নয়; বরং ‘সর্বহারা’ নামটির ভয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়কে কেউ নতুন কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে কি না।
যদি এটি সত্যিই কোনো পুরোনো নেটওয়ার্কের নতুন তৎপরতা হয়, তাহলে তার সাংগঠনিক কাঠামো, নেতৃত্ব ও উদ্দেশ্যের প্রমাণ তদন্তে উঠে আসার কথা। আর যদি এটি নিছক প্রতারণা বা চাঁদাবাজির কৌশল হয়, তাহলে পুরোনো একটি রাজনৈতিক নামকে বেছে নেওয়ার কারণও খুঁজে দেখা প্রয়োজন। কারণ, এমন নাম সাধারণ মানুষের মধ্যে অতীতের আতঙ্ক ও পরিচিতির কারণে আলাদা প্রভাব তৈরি করতে পারে।
রাবির ঘটনা তাই শুধু একটি জিডির গল্প নয়
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হুমকির ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিশ্চিত তথ্য হলো—একাধিক ব্যক্তি একই পরিচয়ে ফোন পেয়েছেন, চাঁদা দাবি করা হয়েছে এবং পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে। এর বাইরে ‘সর্বহারা’ সংগঠনটি নতুন করে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হয়েছে—এমন দাবি করার মতো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবু ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহু বছর ধরে আড়ালে থাকা একটি নাম আবার জনপরিসরে ফিরে এসেছে আদর্শের বিতর্ক নিয়ে নয়, আতঙ্ক ও চাঁদা দাবির অভিযোগ নিয়ে।
সেই কারণে এখন নজর শুধু হুমকি দেওয়া ফোনের দিকে নয়—ফোনের ওপাশে আসলে কে, ‘সর্বহারা’ নামটি কেন, এবং এই নামের আড়ালে কী উদ্দেশ্য কাজ করছে—তার উত্তরেই লুকিয়ে আছে পুরো ঘটনার আসল রহস্য।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬