Loading...

মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-লুটপাট
মধ্যরাতে দুই শতাধিক মানুষ এলেন। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা হলো। ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করল। এরপর ট্রাক ও ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। সবশেষে জমিতে টাঙিয়ে দেওয়া হলো নতুন সাইনবোর্ড!


মধ্যরাতে দুই শতাধিক মানুষ এলেন। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করা হলো। ওষুধ, টিকা, নগদ টাকা ও চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট করল। এরপর ট্রাক ও ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। সবশেষে জমিতে টাঙিয়ে দেওয়া হলো নতুন সাইনবোর্ড!
রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কয়েক মিনিটের কোনো হঠাৎ হামলা ছিল না। স্বাস্থ্যকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত ১২টা থেকে প্রায় ২টা পর্যন্ত চলে ভাঙচুর, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের কাজ। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
কেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতারের অভিযোগ, হামলাকারীরা ২০০ থেকে ২৫০ জন ছিলেন। তারা ‘সম্মাননা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর ব্যানারে এসেছিলেন। তার দাবি, লুট ও ধ্বংসে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মামলায় মো. হানিফ মিয়াসহ ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
অন্যদিকে সমবায় সমিতি দাবি করছে, জমিটি ২০০৬ সালে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং ২০২১ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ তাদের নামে নিবন্ধন করে। তাদের ভাষ্য, জমি থেকে দখলদারদের সরানোর জন্য গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ চিঠিও দিয়েছিল। অর্থাৎ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে এবং দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

কিন্তু জমি কার, সেই বিরোধের নিষ্পত্তির জায়গা আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়া। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানও শনিবার বলেছেন, জমি নিয়ে কোনো আইনগত বিরোধ থাকলে তার সমাধান আদালতের মাধ্যমেই হতে হবে।
কেন্দ্রটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, হামলার সময় পুলিশকে জানানো হয়েছিল এবং পুলিশ ঘটনাস্থলেও গিয়েছিল, কিন্তু স্থাপনাটি রক্ষা করতে পারেনি। একটি প্রতিবেদনে স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর জমিটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা নিয়ে অভিযোগও এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে সাম্প্রতিক অতীত। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মাজারে ৯৭টি হামলার তথ্য নথিভুক্ত করেছে মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ। সংস্থাটির ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনায় মাত্র ১১টি মামলা হয়েছিল এবং এর মধ্যে ১০টির তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পাওয়া যায়নি। ওই হামলাগুলোতে তিনজন নিহত এবং ৪৬৮ জন আহত হওয়ার তথ্যও তারা দিয়েছে।
সরকারি তথ্যেও পদক্ষেপের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতার ছবি আছে। ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক উপাদান রয়েছে বলে পুলিশ চিহ্নিত ৭১টি ঘটনার মধ্যে ছিল ৩৮টি মন্দির ভাঙচুর ও আটটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা। এসব ঘটনায় ৫০টি মামলা এবং ৫০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছিল সরকার।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায়ও বহু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। চার মাস পর প্রথম আলো জানায়, তাদের কার্যালয়ে হামলার মামলায় ৩৮ জন গ্রেপ্তার হলেও অনেক হামলাকারী তখনো শনাক্ত হয়নি। একই সময় ছায়ানট ও উদীচীতেও হামলা হয়েছিল; ছায়ানটের ঘটনায় ৩০০ থেকে ৩৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়।
মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে, কিছু ঘটনায় অভিযোগপত্রও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার ধারায় কতগুলো মামলার বিচার শেষ হয়েছে, কতজন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন কিংবা কত মামলা মাঝপথে থেমে আছে, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে নেই। শুধু ‘গ্রেপ্তার’কে বিচার সম্পন্ন হওয়ার সমার্থক ধরাও তাই ভুল।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিরপুরের নিম্ন আয়ের মানুষকে মাতৃ ও শিশুসেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সেবা দিয়ে আসছিল। সেই প্রতিষ্ঠান যদি জমির বিরোধের মধ্যেও রাতারাতি বলপ্রয়োগে গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে প্রশ্নটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়। মাজার, উপাসনালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমে হামলার পর এবার একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রও একই ধরনের সহিংসতার তালিকায় যুক্ত হলো।
প্রশ্ন তাই শুধু কারা হামলা করেছে নয়। প্রশ্ন হলো, হামলা চলার সময় রাষ্ট্র কোথায় ছিল এবং ঘটনার পর গ্রেপ্তার থেকে বিচার পর্যন্ত আইন কত দ্রুত ও কত দূর যাবে। কারণ প্রতিটি হামলার পর একই চক্র যদি হয়—ঘটনা, নিন্দা, মামলা, কয়েকটি গ্রেপ্তার, তারপর দীর্ঘ নীরবতা—তাহলে পরের হামলাকারীর জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক বার্তাটি তৈরি হয় সেখানেই।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬