Loading...

পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, তবু নিয়োগপত্র নেই
তথ্য ও সনদে অসংগতি পাওয়া গেলে নিয়োগপত্র স্থগিত রেখে কারণ ও মতামতসহ ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পরেও ভেরিফিকেশন ও নথি যাচাইয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ আটকে যাওয়ার সুযোগ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই রাখা হয়েছে।


লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নির্বাচিত হওয়ার পরও নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন শত শত প্রার্থী। নিয়োগপত্র বিতরণ শুরুর পর বিভিন্ন জেলার প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কারও নাম তালিকায় নেই, আবার কেউ কেউ জানতে পেরেছেন পুলিশ বা গোয়েন্দা যাচাইয়ে তাঁদের বিষয়ে আপত্তি এসেছে। তবে ঠিক কতজনের নিয়োগ আটকে আছে এবং প্রত্যেকের ক্ষেত্রে কী কারণে এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ কোনো সরকারি তালিকা বা ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর শেষ ধাপের ভেরিফিকেশন নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
‘সহকারী শিক্ষক নিয়োগ–২০২৫’ কার্যক্রমে মোট ১৪ হাজার ৩৮৫টি পদ বিজ্ঞাপিত হলেও চূড়ান্তভাবে নিয়োগের জন্য প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হন ১৪ হাজার ৩৮৪ জন। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিন পার্বত্য জেলা বাদে ৬১ জেলায় লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উত্তীর্ণ ৬৯ হাজার ২৬৫ জনকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নেওয়া হয়। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত চূড়ান্ত ফলে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে নির্বাচিত করা হয়।
নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এসে জটিলতাটি প্রকাশ্যে আসে। ১৭ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় নিয়োগপত্র ও পদায়ন আদেশ জারির প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়। এর ভিত্তিতে ২১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এরপর ২৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন জেলায় নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে নির্বাচিত প্রার্থীদের একটি অংশ অভিযোগ করেন, তাঁদের নামে নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী ১ অক্টোবর যোগদান এবং ৪ অক্টোবর পদায়ন আদেশ জারির কথা রয়েছে। ফলে যোগদানের মাত্র কয়েক দিন আগে নিয়োগপ্রক্রিয়ার শেষ ধাপ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ে অবশ্য এখনো নিশ্চিত কোনো সরকারি হিসাব নেই। ২৪ সেপ্টেম্বর জাগো নিউজ ১৫ জেলার তথ্যের ভিত্তিতে ৩৫১ জনের কথা জানিয়েছে। পরদিন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস ২৭ জেলার প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৭৭৮ জনের হিসাব প্রকাশ করে। একই সময়ে একটি প্রার্থী প্ল্যাটফর্ম প্রায় ১ হাজার ২০০ জন এবং আন্দোলনকারী মো. লোকমান প্রায় দেড় হাজার জনের নিয়োগ আটকে থাকার দাবি করেন। এসব সংখ্যা একত্র করে জাতীয় মোট হিসাব বলা যাচ্ছে না, কারণ একই প্রার্থীর তথ্য একাধিক তালিকায় থাকতে পারে। তাছাড়া নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়া, তালিকায় নাম না থাকা, নিয়োগ স্থগিত থাকা এবং নিয়োগ বাতিল এসব অবস্থাও এক নয়। এখন পর্যন্ত সবার চূড়ান্ত নিয়োগ বাতিলের কোনো একক সরকারি তালিকা পাওয়া যায়নি।
প্রার্থীদের অভিযোগের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো, তাঁদের কেন বাদ দেওয়া হয়েছে বা নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, তা স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে না। চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণের প্রার্থী তামান্না অভিযোগ করেছেন, তিনি ও তাঁর পরিবার রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় আরোপ করে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর নামে নিয়োগপত্র ইস্যু হয়নি বলে দাবি করেন। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার প্রার্থী সুমাইয়াও জানান, পরীক্ষায় নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি নিয়োগপত্র পাননি। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং পরিবারের কয়েকজন বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট যাচাই প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় কারণগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত ভিন্ন। ২৪ সেপ্টেম্বর অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী বলেছেন, ডাকযোগে পাঠানো নিয়োগপত্র বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে। তাঁর কাছে কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বাদ পড়েছেন এমন তথ্য তখনো আসেনি। সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি জানান। মুন্সিগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাও বলেন, যাঁদের নিয়োগপত্র দেওয়ার নির্দেশনা এসেছে, তাঁদের তা দেওয়া হচ্ছে; অন্যদের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। মন্ত্রণালয়ের বিদ্যালয়–২ শাখার উপসচিব রাজীব কুমার সরকারও বলেছেন, নিয়োগপত্রের তালিকা অধিদপ্তরের কাছে রয়েছে, তবে নির্বাচিত সবাই নিয়োগপত্র পাবেন কি না, তা তাঁর জানা নেই।
তবে নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপে যাচাইয়ের বিষয়টি যে প্রক্রিয়ার অংশ, তা সরকারি নির্দেশনায় স্পষ্ট। প্রকাশিত নির্দেশনায় বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত উপযুক্ততা, ডোপ টেস্ট এবং পুলিশ ও এনএসআইয়ের প্রতিবেদন যাচাইয়ের কথা রয়েছে। পুলিশ বা গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিরূপ মন্তব্য থাকলে নিয়োগ আদেশ জারি না করার নির্দেশনাও রয়েছে। আবার তথ্য ও সনদে অসংগতি পাওয়া গেলে নিয়োগপত্র স্থগিত রেখে কারণ ও মতামতসহ ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অধিদপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পরেও ভেরিফিকেশন ও নথি যাচাইয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ আটকে যাওয়ার সুযোগ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই রাখা হয়েছে।
এই যাচাইপ্রক্রিয়া নিয়েই এখন মূল বিতর্ক। প্রার্থীদের সংগঠন ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক–২০২৫’ নিরপেক্ষ পুনঃযাচাই, আত্মপক্ষ সমর্থন ও প্রশাসনিক আপিলের সুযোগ, প্রশাসনিক ভুল সংশোধন এবং আটকে থাকা নিয়োগের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, অনিয়মকারী বা অযোগ্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার দাবি তারা করছে না; বরং ভুল তথ্য, প্রশাসনিক ত্রুটি বা অন্য কোনো ভুলের কারণে যোগ্য কেউ যেন বঞ্চিত না হন, সেটিই তাদের মূল দাবি।
বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোরও প্রতিক্রিয়া এসেছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, গোয়েন্দা যাচাইয়ের নামে অন্তত এক হাজার প্রার্থীর নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছে এবং বাদ পড়াদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা জিডি নেই। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ভেরিফিকেশনের আইনি ভিত্তি ও বাদ দেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রত্যেক প্রার্থীর সিদ্ধান্তের কারণ ও যাচাইয়ের মানদণ্ড প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। এবি পার্টির পক্ষ থেকেও অভিযোগের ভিত্তি যাচাইয়ের সুযোগ ও স্বাধীন পুনর্তদন্তের কথা বলা হয়েছে। এসবই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও নেতাদের বক্তব্য; প্রত্যেক প্রার্থীর বিষয়ে প্রশাসনিক যাচাইয়ের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানও বলেছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক মত বা পরিবারের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে কাউকে শিক্ষক পদে নিয়োগ না দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, শিক্ষক বাছাইয়ে বিষয়জ্ঞান, পাঠদানের দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতির মতো যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে এটিও একটি শিক্ষাবিদের মূল্যায়ন; নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীর বাদ পড়ার কারণ বা সরকারি যাচাই প্রতিবেদনের ফল নয়।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কতজনের নিয়োগপত্র আটকে থাকবে এবং তাঁদের ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রশাসনিক নির্দেশনা অনুযায়ী ওই সময়ের মধ্যে তথ্য বা সনদের অসংগতি-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানোর কথা। একই সময়ে নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের একাংশ ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। এরপর ১ অক্টোবর যোগদানের নির্ধারিত তারিখ এবং ৪ অক্টোবর পদায়ন আদেশ জারির সূচি রয়েছে।
অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্য বলছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পরও একটি অংশ নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না, কিন্তু দেশব্যাপী ঠিক কতজনের নিয়োগ আটকে আছে, কার ক্ষেত্রে কী অভিযোগ রয়েছে এবং কার নিয়োগ স্থগিত, কার বাতিল এসবের পূর্ণাঙ্গ সরকারি চিত্র এখনো সামনে আসেনি। একই সঙ্গে পুলিশ বা এনএসআইয়ের ব্যক্তি-নির্দিষ্ট যাচাই প্রতিবেদনও প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিয়োগে বৈষম্যের অভিযোগকে এই মুহূর্তে প্রমাণিত ঘটনা বলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি নিয়োগপত্র না পাওয়া সব প্রার্থীর নিয়োগ বাতিল হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়া যায় না। ২৮ সেপ্টেম্বরের পর প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ও ব্যক্তি-নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোই এই বিতর্কের পরবর্তী চিত্র স্পষ্ট করবে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬