Loading...

৫৩ মাস ধরে কমছে ক্রয়ক্ষমতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছুঁতে পারেনি।


“চাল কিনতে গেলে ফল কিনতে পারছি না” বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে আসা এই একটি বাক্যেই সীমিত আয়ের মানুষের বর্তমান জীবনযাত্রার সংকট চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যায় এক যুবক বর্তমান বাজারের অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকের করা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে এভাবেই বাস্ততা তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন, ‘বেঁচে আছি মনের জোরে’।
বেঁচে থাকার জন্য নূন্যতম খাবার কিনতেই যখন আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে, তখন ফল, মাছ-মাংস, চিকিৎসা, পোশাক কিংবা বিনোদনের মতো ব্যয় কাটছাঁট করতে হচ্ছে বহু পরিবারকে। সরকারি পরিসংখ্যানও বলছে, টানা ৫৩ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি কম হারে বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। এরপর চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কোনো মাসেই মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতিকে ছুঁতে পারেনি। জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, বিপরীতে মজুরি বেড়েছে ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ কাগজে আয় কিছুটা বাড়লেও পণ্য ও সেবার দাম আরও দ্রুত বাড়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
২০২১ সাল পর্যন্ত দেশে মূল্যস্ফীতি মোটামুটি ৭ শতাংশের নিচে ছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে খাদ্য, জ্বালানি ও কাঁচামালের দাম বাড়ে। একই বছরের আগস্টে দেশে জ্বালানি তেলের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়েও বাজারে উচ্চমূল্যের চাপ স্থায়ী হয়।
এই চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ছে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের ওপর। বিবিএসের হিসাবে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এই খাতে পরিচালিত হয় এবং পাঁচ কোটির বেশি নারী-পুরুষ এখানে কাজ করেন। তাদের অধিকাংশের নির্ধারিত বেতনকাঠামো, নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি কিংবা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ নেই। ফলে খাদ্য, বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় বাড়লে সরাসরি ভোগ কমানো অথবা ঋণ করে সংসার চালানো ছাড়া বিকল্প থাকে না।
রাজধানীর একটি বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানের কর্মী রাজিব হোসেনের অভিজ্ঞতাও একই। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাঁর বেতন বাড়েনি। ২০২৬ সালে পাঁচ হাজার টাকা বেড়ে মাসিক বেতন ৪৫ হাজার টাকা হলেও গত তিন বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে তিনবার।

আগে মাসে চার-পাঁচ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারলেও এখন মাসের শেষ দিকে ধার করতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর মতো বহু মধ্যবিত্ত পরিবার খাবারের মান কমানো, চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া এবং বিনোদন বা ভ্রমণের ব্যয় প্রায় বন্ধ করে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে।
এর মধ্যেই নতুন বেতনকাঠামোয় প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়ছে। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ তৈরি হলে নিত্যপণ্য, বাসাভাড়া ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সরকারি চাকরির বাইরে থাকা মানুষের আয় একই হারে না বাড়লে দুই শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানও বাড়বে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ব্যয়ক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সর্বশেষ সূচকেও চাপের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স বা পিএমআই আগস্টে ৭ দশমিক ৯ পয়েন্ট কমে ৪৯ দশমিক ৯-এ নেমেছে। পিএমআই ৫০-এর নিচে থাকা সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন নির্দেশ করে। উৎপাদন খাতের সূচক ১৮ পয়েন্ট কমে ৪৭ দশমিক ৪ এবং সেবা খাত ৬ দশমিক ৮ পয়েন্ট কমে ৪৯ দশমিক ২ হয়েছে।
তবে কৃষি খাতের পিএমআই ৫৬ দশমিক ৫ এবং নির্মাণ খাতের সূচক ৫২ দশমিক ৪ হওয়ায় এই দুই খাতে সম্প্রসারণ বজায় রয়েছে। বিপরীতে উৎপাদন খাতে নতুন অর্ডার, রপ্তানি, আমদানি, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান—সব সূচকই সংকুচিত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ব্যাংকঋণ পেতে জটিলতা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের ঘাটতি, পোশাকের অর্ডার কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বাজার তদারকি শক্তিশালী করা, সিন্ডিকেট ও সরবরাহজনিত বাধা নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতের মজুরি সমন্বয় এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রকৃত সুবিধাভোগী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা না হলে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরির ব্যবধান আরও দীর্ঘ হবে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬