Loading...

চিকিৎসায় নতুন উদ্ভাবন
ব্যাটারিটির সর্বোচ্চ উন্মুক্ত-বর্তনী ভোল্টেজ পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৮৪ ভোল্ট। গবেষকেরা দেখিয়েছেন, এতটুকু শক্তি অতি কম বিদ্যুৎ খরচের কিছু চিকিৎসা-যন্ত্র চালানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে। ছোট আকারের ব্যাটারিটি প্রচলিত ওষুধের ক্যাপসুলের মতো আকৃতির আবরণের ভেতরে বসানো সম্ভব হয়েছে।


একসময় শরীরের ভেতরে কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র ঢোকানোর কথা উঠলেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল তার বিদ্যুৎ আসবে কোথা থেকে? শরীরের ভেতরে থাকা প্রচলিত ব্যাটারি নষ্ট হলে বা খোলস ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিষাক্ত উপাদানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আবার যন্ত্রটি কাজ শেষ করার পর ব্যাটারি বের করতে হলে নতুন চিকিৎসা-প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এই সমস্যার ভিন্ন একটি সমাধান নিয়ে এবার কাজ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকেরা। তাঁরা এমন একটি ক্ষয়শীল ব্যাটারি তৈরি করেছেন, যা গিলে খাওয়ার পর কিছু সময় বিদ্যুৎ দিতে পারে, এরপর ধীরে ধীরে শরীরের ভেতরেই ভেঙে যেতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে Nature Chemical Engineering-এ। ব্যাটারিটির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে ম্যাগনেশিয়াম ও মলিবডেনাম ট্রাইঅক্সাইড দিয়ে। এর ওপর ব্যবহার করা হয়েছে কাগজের মতো একটি স্তর এবং অম্লীয় পরিবেশের প্রভাব ধীর করার জন্য মোমজাত আবরণ। পুরো নকশার লক্ষ্য ছিল এমন একটি বিদ্যুৎ উৎস তৈরি করা, যা শরীরের ভেতরে সাময়িক কাজ করবে কিন্তু পরে স্থায়ী ইলেকট্রনিক বর্জ্য হয়ে থাকবে না।
এরপর পরীক্ষাটি শুধু পরীক্ষাগারের তরলে আটকে থাকেনি। গবেষকেরা জীবন্ত শূকরের শরীরেও এটি পরীক্ষা করেছেন। শূকরের পরিপাকতন্ত্র মানুষের সঙ্গে অনেক দিক থেকে তুলনীয় হওয়ায় এ ধরনের গবেষণায় এটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়। পরীক্ষায় ব্যাটারি পাকস্থলীর ভেতরে তিন দিন পর্যন্ত কার্যকর ছিল। এই সময়ের মধ্যে এটি একটি গিলে ফেলা যায় এমন যন্ত্রকে বিদ্যুৎ দিয়েছে এবং বাইরে থাকা পাঠকের কাছে বেতার সংকেত পাঠানোর মতো কাজও চালিয়েছে।
এর একটি সম্ভাব্য ব্যবহার হচ্ছে ওষুধ খাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। অনেক চিকিৎসায় রোগীকে নির্দিষ্ট সময়ে ওষুধ খেতে হয়, কিন্তু চিকিৎসক সবসময় জানতে পারেন না রোগী সত্যিই ওষুধটি খেয়েছেন কি না। গবেষকেরা এমন একটি ক্যাপসুলে ব্যাটারি-চালিত বেতার শনাক্তকারী যুক্ত করেছেন, যা গিলে ফেলার পর সংকেত পাঠাতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে চিকিৎসক বা পরিচর্যাকারী জানতে পারবেন, নির্ধারিত ওষুধটি রোগীর শরীরে পৌঁছেছে কি না।

আরেকটি পরীক্ষায় ব্যাটারির সাহায্যে পাকস্থলীতে বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেওয়া হয়েছে। গবেষকেরা একটি ক্ষুদ্র যন্ত্রের মাধ্যমে পাকস্থলীর নির্দিষ্ট অংশে বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠান। শূকরের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ক্ষুধার সঙ্গে সম্পর্কিত ঘ্রেলিন হরমোনের মাত্রায় পরিবর্তন দেখা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পাকস্থলীকে বৈদ্যুতিকভাবে উদ্দীপিত করার কৌশল নিয়ে আগে থেকেই গবেষণা চলছে; নতুন ব্যাটারির লক্ষ্য হলো এ ধরনের সাময়িক চিকিৎসা-যন্ত্রকে এমন একটি শক্তির উৎস দেওয়া, যা পরে শরীর থেকে আলাদা করে বের করার প্রয়োজন না-ও হতে পারে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় পার্থক্য প্রচলিত ব্যাটারির সঙ্গে। সাধারণ ব্যাটারির ভেতরে এমন উপাদান থাকতে পারে, যা শরীরে থেকে গেলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে শরীরে দীর্ঘদিন থাকার কথা নয় এমন কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্রের জন্য প্রচলিত ব্যাটারি একটি অস্বস্তিকর সমাধান। নতুন ব্যাটারিটির নকশায় বরং এমন উপাদান বেছে নেওয়া হয়েছে, যা নির্দিষ্ট সময় কাজ করার পর শরীরের ভেতরেই ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে পারে। গবেষকেরা এটিকে শরীরে শোষিত হয়ে যেতে পারে এমন ব্যাটারি হিসেবে দেখছেন।
আরেকটি সীমাবদ্ধতাও গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় ব্যবহৃত পুরো চিকিৎসা-যন্ত্রের প্রতিটি অংশ এখনো শরীরে ক্ষয়শীল ছিল না। গবেষকদের পরীক্ষায় ব্যবহৃত একটি বৈদ্যুতিক সার্কিট বোর্ড শরীরে থেকে যায়নি; সেটি স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে গেছে। অর্থাৎ পুরো যন্ত্রটাই শরীরে মিশে যাবে এ পর্যায়ে প্রযুক্তি এখনো পৌঁছায়নি। গবেষণার পরবর্তী লক্ষ্যগুলোর একটি হলো আরও বেশি অংশকে শরীরে নিরাপদে ক্ষয়শীল করা এবং মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহারের আগে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা যাচাই করা।
তারপরও এই আবিষ্কারের সম্ভাবনা বড়। ভবিষ্যতে এমন ছোট ক্যাপসুল তৈরি হতে পারে, যা শরীরের ভেতরে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন কোনো নির্দিষ্ট কাজ করবে, কখনো ওষুধের উপস্থিতি শনাক্ত করবে, কখনো শরীরের কোনো অংশের তাপমাত্রা বা অন্যান্য জৈবিক সংকেত মাপবে, আবার কখনো চিকিৎসার জন্য সামান্য বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দেবে। কাজ শেষ হলে সেটিকে অস্ত্রোপচার করে বের করার প্রয়োজন হবে না। সেই দিক থেকে এটি শুধু ব্যাটারি প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়; শরীরের ভেতরের সাময়িক চিকিৎসা-যন্ত্রের নকশাই বদলে দিতে পারে।
এখন পর্যন্ত ব্যাটারিটির সবচেয়ে বড় সাফল্য হচ্ছে একটি ছোট বিদ্যুৎ উৎসকে শরীরের ভেতরে রেখে তা দিয়ে বাস্তব ইলেকট্রনিক কাজ করানো সম্ভব হয়েছে। আগামী ধাপে দেখতে হবে, কতদিন নিরাপদভাবে এটি কাজ করতে পারে, ক্ষয় হওয়ার সময় শরীরে কী উপাদান ছাড়ে, দীর্ঘমেয়াদে কোনো ক্ষতি হয় কি না এবং মানুষের শরীরেও একই ফল পাওয়া যায় কি না।
অর্থাৎ এখনো এমন দিন আসেনি যে মানুষ নিশ্চিন্তে ব্যাটারি খেয়ে চিকিৎসা নিতে পারবে। কিন্তু গবেষণাটি সেই ভবিষ্যতের একটি বাস্তব নমুনা দেখিয়েছে। শরীরের ভেতরে ঢুকবে একটি ক্ষুদ্র যন্ত্র, কিছুদিন কাজ করবে, তারপর তার বিদ্যুৎ-উৎসটাই ধীরে ধীরে শরীর থেকে হারিয়ে যাবে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬