Loading...

১৪৮ পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক দুজন
নরওয়েতে কারাবন্দী অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ফিনল্যান্ডে রয়েছে বন্দীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের আলাদা স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট। ইংল্যান্ডে কারাগারের চিকিৎসা চলে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অধীনে। আর বাংলাদেশে ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত ১৪৮ চিকিৎসক পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন।


নরওয়েতে কারাবন্দী অসুস্থ হলে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় নিয়মিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা। ফিনল্যান্ডে রয়েছে বন্দীদের জন্য জাতীয় পর্যায়ের আলাদা স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট। ইংল্যান্ডে কারাগারের চিকিৎসা চলে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অধীনে। আর বাংলাদেশে ৭৫টি কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত ১৪৮ চিকিৎসক পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন।
এই ব্যবধান শুধু কাগজে-কলমে নয়, এর মূল্য দিতে হচ্ছে জীবন দিয়ে। ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৫ বছর ৯ মাসে দেশের কারাগারে মারা গেছেন ১ হাজার ২৩৫ বন্দী। তাদের অন্তত ৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই। চলতি বছরের প্রথম প্রায় নয় মাসেই মারা গেছেন অন্তত ২৫১ জন।
দেশের কারাগারগুলোতে এখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী। চিকিৎসক নেই, অধিকাংশ কারাগারে নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নেই, বিশেষায়িত চিকিৎসাও সীমিত। গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে কখনো সাধারণ কারা যানবাহন বা ভাড়া করা গাড়িতে হাসপাতালে নিতে হচ্ছে।
প্রশ্ন তাই শুধু কারা হাসপাতালের দুরবস্থা নিয়ে নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন বন্দীর চিকিৎসাকে মূল স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখছে, তখন বাংলাদেশ কেন এখনো এমন একটি ব্যবস্থায় আটকে আছে, যেখানে হাসপাতালে পৌঁছানোই কখনো কখনো হয়ে উঠছে জীবন-মৃত্যুর লড়াই?

ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার, বন্দী ১ লাখের বেশি
দেশের কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। ২৯ সেপ্টেম্বর সেখানে বন্দী ছিলেন প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় ২ দশমিক ৩৫ গুণ মানুষকে রাখতে হচ্ছে কারাগারে।
অতিরিক্ত বন্দীর চাপ শুধু থাকার জায়গায় পড়ে না। একই চিকিৎসককে অনেক বেশি রোগী দেখতে হয়, সীমিত হাসপাতাল শয্যা ও ওষুধ ভাগ হয় কয়েক গুণ বেশি মানুষের মধ্যে। হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণও কঠিন হয়ে পড়ে।
কারা সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার বৃদ্ধি, রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার এবং অনেক বিচারাধীন বন্দীর দীর্ঘ সময় জামিন না পাওয়াও বন্দী বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বন্দী বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি চিকিৎসার সক্ষমতা।
১৪৮ পদের বিপরীতে স্থায়ী চিকিৎসক দুজন
কারা অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের ৭৫ কারা হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসক পদ ১৪৮টি। স্থায়ী চিকিৎসক আছেন মাত্র দুজন। ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে শতাধিক চিকিৎসককে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দেওয়া হলেও তারা সাধারণত দিনের নির্দিষ্ট সময়ে সেবা দেন।
ফলে রাত বা ভোরে কোনো বন্দী স্ট্রোক, হৃদ্রোগ কিংবা তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হলে অধিকাংশ কারাগারে ২৪ ঘণ্টা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার সুযোগ নেই। কোনো কোনো কারা হাসপাতালে একজন চিকিৎসককে দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ বন্দী পর্যন্ত দেখতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে নার্স, প্যারামেডিক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জনবল সংকট। অথচ আন্তর্জাতিকভাবে বন্দীর স্বাস্থ্যসেবাকে আলাদা কোনো দয়া হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার নীতি প্রতিষ্ঠিত।

নরওয়েতে কারা প্রশাসন নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থাই দায়িত্বে
নরওয়েতে যে পৌরসভায় কারাগার রয়েছে, সেই পৌর কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় বন্দীরাও থাকেন। দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, কারাবন্দীদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পৌরসভার। অর্থাৎ বন্দীর চিকিৎসা শুধু কারা প্রশাসনের নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়।
এই ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো কারাগারের ভেতরের চিকিৎসাকে সাধারণ নাগরিকের স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন না করা। জাতিসংঘের নেলসন ম্যান্ডেলা বিধিতেও একই নীতি রয়েছে। এতে বন্দীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলা হয়েছে এবং কারা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সাধারণ জনস্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রাখার কথা বলা হয়েছে।
ফিনল্যান্ডে প্রায় প্রতিটি কারাগারে স্বাস্থ্যকেন্দ্র
ফিনল্যান্ডে বন্দীদের চিকিৎসার জন্য রয়েছে পৃথক জাতীয় সংস্থা, বন্দী স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ। এটি দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য ও কল্যাণ ইনস্টিটিউটের অধীনে পরিচালিত হয় এবং কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।
ফিনল্যান্ডের প্রায় প্রতিটি কারাগারেই বহির্বিভাগীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। সেখানে নার্স বন্দীকে প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা করেন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে পাঠানো হয়। তীব্র ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি বন্দীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা পর্যন্ত করা হয়। প্রয়োজন হলে বন্দীকে কারা হাসপাতাল, মনোরোগ হাসপাতাল কিংবা সাধারণ নাগরিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিশেষায়িত চিকিৎসায় পাঠানো হয়।
বাংলাদেশে বিপরীতে অধিকাংশ কারা হাসপাতালে মূলত প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। হৃদ্রোগ, কিডনি, লিভার, স্ট্রোক বা অন্য জটিল রোগে বাইরের সরকারি বা বিশেষায়িত হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক জায়গায় যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ জনবল না থাকায় সেগুলো ব্যবহার করা যায় না। কাশিমপুরের ২০০ শয্যার কারা হাসপাতালেও প্রায় এক দশক আগে কেনা কিছু আধুনিক চিকিৎসা ও রোগনির্ণয় যন্ত্র দক্ষ জনবলের অভাবে ব্যবহার করা যায়নি।
ইংল্যান্ডেও সংকট আছে, কিন্তু স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে নয়
ইংল্যান্ডে বন্দীদের স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্বে রয়েছে দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। প্রাথমিক চিকিৎসা, হাসপাতাল সেবা, মানসিক স্বাস্থ্য, দন্তচিকিৎসা এবং মাদকাসক্তির চিকিৎসাও এই কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। সরকারি নীতি অনুযায়ী, বন্দীরা কারাগারের বাইরের মানুষের সমমানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
ইংল্যান্ডের ব্যবস্থাও নিখুঁত নয়। দেশটির প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় কারাগারে চিকিৎসার ঘাটতি, তথ্য আদান-প্রদানের সমস্যা এবং বন্দীদের এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
তবে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও কারা কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে বন্দীদের সাধারণ জনগণের সঙ্গে তুলনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বহন করে। বাংলাদেশের সঙ্গে বড় পার্থক্য এখানেই। সমস্যা সেখানেও আছে, কিন্তু কারা স্বাস্থ্যসেবা মূল স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাইরে পড়ে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নয়।

সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘাটতি অ্যাম্বুলেন্সে
বাংলাদেশে গুরুতর রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসক সংকটের পর দ্বিতীয় বড় বাধা পরিবহন। ৭৫ কারা হাসপাতালের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। অনেক বন্দীকে সাধারণ কারা যানবাহন বা ভাড়া করা গাড়িতে হাসপাতালে নিতে হয়। এসব গাড়িতে সাধারণত অক্সিজেন বা পথে জরুরি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার সুযোগ থাকে না। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাতে যানজটের কারণে কখনো তিন ঘণ্টাও লাগে বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
জেলা কারাগারের রোগীদের ক্ষেত্রে পথ আরও দীর্ঘ হতে পারে। অনেককে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করে পরে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানো হয়। যে রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিট গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে প্রশাসনিক এই বহু ধাপ জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।
হাসপাতাল আছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যব্যবস্থা নেই
বাংলাদেশের কারা হাসপাতালের সংকট তাই শুধু ভবন, শয্যা বা যন্ত্রপাতির নয়। বড় সমস্যা কাঠামোয়। কারাগার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে, অথচ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর জন্য নির্ভর করতে হয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের ওপর। কারা অধিদপ্তরের নিজস্ব পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য কাঠামো নেই, যেখানে চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসাসহকারী, পরীক্ষাগার প্রযুক্তিবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা স্থায়ীভাবে কাজ করবেন।
ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামালও চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কথা বলেছেন। তার মতে, কারা হাসপাতালেই তাৎক্ষণিক ও পর্যাপ্ত চিকিৎসা দেওয়া গেলে কিছু বন্দীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হতে পারত।
মানবাধিকারকর্মী মো. নুর খান মনে করেন, বন্দী রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকায় তার খাদ্য, নিরাপত্তার পাশাপাশি চিকিৎসা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া বা হাসপাতালে স্থানান্তরে ব্যর্থতার কারণে মৃত্যু হলে রাষ্ট্র ও কারা কর্তৃপক্ষ সেই দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।
নরওয়ে, ফিনল্যান্ড কিংবা ইংল্যান্ডের ব্যবস্থা হুবহু বাংলাদেশে বসিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন সরল সমীকরণ নেই। তবে এসব দেশের অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: কারাবন্দীর চিকিৎসা কি কারা প্রশাসনের একটি সহায়ক কার্যক্রম, নাকি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থারই অংশ? বাংলাদেশে গত প্রায় ছয় বছরে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই অন্তত ৩০০ বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। সংখ্যাটি সেই প্রশ্নকে আর তাত্ত্বিক থাকতে দিচ্ছে না।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬