Loading...

উন্নয়নে শতকোটি টাকা, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা
রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ঢুকলে এখন সবুজের চেয়ে কংক্রিটই বেশি চোখে পড়ে। কোনো হাঁটার পথে শ্যাওলা, কোথাও বড় ঘাস। দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই, অন্যটির পানি কচুরিপানা ও আবর্জনায় ঢাকা। উন্নয়নের নামে ২০১৭ সাল থেকে বন্ধ থাকা পার্কটি নয় বছরেও পুরোপুরি নাগরিকদের কাছে ফেরেনি।


রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ঢুকলে এখন সবুজের চেয়ে কংক্রিটই বেশি চোখে পড়ে। কোনো হাঁটার পথে শ্যাওলা, কোথাও বড় ঘাস। দুটি জলাশয়ের একটিতে পানি নেই, অন্যটির পানি কচুরিপানা ও আবর্জনায় ঢাকা। উন্নয়নের নামে ২০১৭ সাল থেকে বন্ধ থাকা পার্কটি নয় বছরেও পুরোপুরি নাগরিকদের কাছে ফেরেনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ২০১৭ সালে ১০৮ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয়। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বরে। পরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ ও দুটি ফটক নির্মাণে আরও ৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। অর্থাৎ কয়েক দফায় প্রায় ১৪৭ কোটি টাকার স্থাপনা হয়েছে পার্কটিতে। নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পার্কের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ জায়গায় স্থাপনা করার বিধান থাকলেও ওসমানী উদ্যানে তা মানা হয়নি। তাদের হিসাবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ জায়গা কংক্রিটে ঢাকা পড়েছে। ডিএসসিসি বলছে, আগামী অক্টোবরে পার্কটি খুলে দেওয়ার লক্ষ্য আছে।
নির্মাণে টাকা আছে, পরিচর্যার হিসাব অস্পষ্ট
ওসমানীর ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মোট বাজেট ৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে পার্ক, খেলার মাঠ ও গণশৌচাগার উন্নয়নে বরাদ্দ সাড়ে ১১ কোটি টাকা; যা মোট বাজেটের প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ। বিপরীতে সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামোয় বরাদ্দ ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।
রক্ষণাবেক্ষণের অর্থও একক খাতে নেই। চলতি বছরে ডিএনসিসি অঞ্চল ১ থেকে ৪-এর পার্ক, কবরস্থান, গাছ লাগানো ও বিদ্যমান গাছের পরিচর্যাসহ একগুচ্ছ কাজের জন্য প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার একটি চুক্তি করেছে। এটি মোট রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট প্যাকেজ। বিভিন্ন পার্কের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মেরামতের কাজ আলাদা আলাদা দরপত্রেও হচ্ছে। ফলে একটি পার্কে বছরে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা রক্ষণাবেক্ষণে যায়, সেই হিসাব সাধারণ নাগরিকের পক্ষে বের করা কঠিন।

ডিএসসিসির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ৪ হাজার ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু গত তিন অর্থবছরে সংস্থাটির ঘোষিত বাজেটের গড়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে প্রকৃত ব্যয় ছিল প্রায় ৮১৪ কোটি টাকা। প্রকাশিত বাজেটের খাতভিত্তিক সারাংশে পার্ক রক্ষণাবেক্ষণের পূর্ণ পৃথক হিসাব পাওয়া যায় না।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের তথ্যভান্ডারে রমনা পার্কের বার্ষিক ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি টাকা। তবে ওই অর্থের কতটা নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, বৃক্ষরক্ষণ বা অবকাঠামো মেরামতে যায়, তার বিস্তারিত সেখানে নেই।
ঢাকার বাইরে সংকট আরও ভিন্ন
হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের সমস্যা কংক্রিট নয়, পানি। যে সাতটি পাহাড়ি ছড়া থেকে বনের নাম, তার চারটির অস্তিত্বই এখন নেই। বাকি তিনটিতেও পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ। দুটি পুকুর বালু-পলিতে ভরাট, আরেকটির গভীরতাও কমে গেছে। বন বিভাগের কর্মকর্তা এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন, শুষ্ক মৌসুমে বন্য প্রাণীর পানের পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
প্রায় ২৪৩ হেক্টরের এই বনে ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ীসহ প্রায় ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলাধার শুকিয়ে গেলে প্রাণী লোকালয়ে ঢুকতে পারে, বাড়তে পারে মানুষ-বন্য প্রাণীর সংঘাত ও শিকারের ঝুঁকি। আশপাশে অনিয়ন্ত্রিত বালু-পাথর উত্তোলনের কারণে ভূমিক্ষয় ও পলি জমাকেও জলাধার ভরাটের একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীর এলিফ্যান্ট ইকো পার্কেও ভিন্ন ধরনের অবহেলার চিত্র পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে প্রায় দেড় একর সরকারি জমিতে নির্মিত পার্কটির বিভিন্ন রাইড ২০২৬ সালের শুরুতেই ভাঙা, আবর্জনা ছড়ানো-ছিটানো অবস্থায় এবং কায়াকিং বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। স্থানীয় প্রশাসনের অর্থায়নে গড়ে ওঠা পার্কটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াই প্রধান অভিযোগ।

গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক ও স্পোর্টস কমপ্লেক্সের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এ বছরের এপ্রিলে সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে গুলশান ইয়ুথ ক্লাবকে দিয়েছে রাজউক। এরপর নগর-পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান আইপিডি সরকারি পার্কে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সংকুচিত হওয়া ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অর্থাৎ কোথাও সমস্যা সরকারি অবহেলা, কোথাও দায়িত্ব বেসরকারি বা ক্লাবভিত্তিক ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পর জবাবদিহির প্রশ্ন।
পার্ক কমলে ক্ষতি শুধু হাঁটার জায়গার নয়
ঢাকার উন্মুক্ত জায়গার সংকট এরই মধ্যে তীব্র। ঢাকা অঞ্চলের পরিকল্পনা-তথ্য অনুযায়ী শহরের জমির মাত্র প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৬ সালের হিসাবে দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের অন্তত ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের গবেষণায় দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ঢাকায় সবুজ জায়গা ১৯৯৫ সালের ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে কমে ৭ দশমিক ০৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে জলাভূমিও ব্যাপকভাবে কমেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, নগরের সবুজ জায়গা মানুষের শারীরিক কর্মকাণ্ড বাড়ায়, মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করে, তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণের প্রভাব কমায় এবং সামাজিক যোগাযোগের জায়গা তৈরি করে। দুর্যোগের সময় খোলা জায়গা আবার মানুষ জড়ো করা, উদ্ধারকাজ ও অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র তৈরির স্থান হিসেবেও জরুরি।
নগর-পরিকল্পনাবিদদের মতে, মূল সমস্যা নতুন পার্ক বানানোর অর্থের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনার ঘাটতি। প্রকল্পে স্থাপনা নির্মাণের অর্থ থাকে, কিন্তু গাছ, জলাধার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও নিয়মিত মেরামতের ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন সংস্থা ও দরপত্রে ছড়িয়ে থাকে। ওসমানী উদ্যান থেকে সাতছড়ি পর্যন্ত বর্তমান চিত্র তাই একই প্রশ্ন তুলছে—উদ্যান নির্মাণ বা সংস্কারে শতকোটি টাকা খরচের পর সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার দায় কার এবং সেই দায় পালনে বছরে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার পরিষ্কার হিসাব কোথায়?
নবোদয়/ এসএন/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬