Loading...

ডলারের ক্ষমতা এখনো প্রবল
বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার ওজন বাড়ছে। উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এই পরিবর্তন লক্ষ করলে এর সপক্ষে তথ্য-প্রমাণ মেলে। তবে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটছে কয়েকটি ভিন্ন গতিতে। নতুন কারখানা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এশিয়া এগোচ্ছে।


বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার ওজন বাড়ছে। উৎপাদন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান এই পরিবর্তন লক্ষ করলে এর সপক্ষে তথ্য-প্রমাণ মেলে। তবে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটছে কয়েকটি ভিন্ন গতিতে। নতুন কারখানা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় এশিয়া এগোচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে ডলারের প্রভাব এখনো প্রবল। বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগের পাশাপাশি এই দ্বৈত বাস্তবতা বোঝাও জরুরি।
সম্প্রতি সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরছে। তার মতে, পশ্চিমা দেশগুলোর শুল্ক ও বাজারে হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়া ঠেকাতে পারবে না। বাংলাদেশের করণীয় হলো বিশ্বজুড়ে উৎপাদন ও বিপণনের মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী করা এবং চীন–ভারতের অর্থনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো। আন্তর্জাতিক গবেষণায় তার বক্তব্যের মূল প্রবণতাটির সমর্থন মেলে।
এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ব্যাখ্যা দিয়েছেন সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক ড্যানি কোয়াহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০১৮ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার হিসাবে আগের ৩৫ বছরে বিশ্ব অর্থনীতির ভরকেন্দ্র প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার পূর্বে সরে গেছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভৌগোলিক বণ্টন নিয়ে তার গবেষণা এশিয়ার উত্থানকে পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে তুলে ধরে।
অর্থনীতির আকারেও পরিবর্তন স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক তুলনা কর্মসূচির ২০২১ সালের হিসাবে, ক্রয়ক্ষমতার সমতায় বৈশ্বিক জিডিপির ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল চীনের; যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভারতের ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এই পদ্ধতিতে দেশভেদে একই পণ্য ও সেবার দামের পার্থক্য সমন্বয় করা হয়।
তবে বাজারের বিনিময় হার দিয়ে করা হিসাব এবং ক্রয়ক্ষমতার হিসাবের ব্যবহার আলাদা। আন্তর্জাতিক বাজারে সম্পদ কেনা, ঋণ পরিশোধ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে নামমাত্র জিডিপিতে কোন দেশ কখন শীর্ষে উঠবে, তা প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, মূল্যস্তর ও বিনিময় হারের ওপর নির্ভর করবে।

শিল্প উৎপাদনে সাম্প্রতিক ব্যবধানও উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা ইউনিডোর হিসাবে, ২০২৫ সালে চীনের উৎপাদনশিল্পে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ; ইউরোপে ১ দশমিক ৫ শতাংশ। চীন বাদেও এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি চার শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রতিযোগিতাটি তাই একটি দেশের মধ্যে সীমিত নয়; অঞ্চলের একাধিক অর্থনীতি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি শিল্পসূচকেও এশিয়ার অগ্রগতি দেখা যায়। ইউনিডো ২০১৫ সালের উৎপাদনকে ১০০ ধরে যে সূচক তৈরি করেছে, তাতে ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অবস্থান ১৫৩ দশমিক ৮। ইউরোপের ১১৪ এবং উত্তর আমেরিকার ৯৭ দশমিক ৩। অর্থাৎ এই হিসাবে এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনভিত্তি অন্য দুই অঞ্চলের তুলনায় অনেক দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ রবার্ট স্টাইগার মার্চের বিশ্লেষণে জানান, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্যবাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির ৭১ শতাংশ এসেছে এশিয়া থেকে। এআই চালাতে প্রয়োজনীয় চিপ, যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের বাণিজ্যেও এশিয়ার অংশ ৬২ শতাংশ। এসব তথ্য নতুন প্রযুক্তির উৎপাদনব্যবস্থায় অঞ্চলের গুরুত্ব দেখায়। স্টাইগারের বিশ্লেষণে এআই বিনিয়োগের সঙ্গে জ্বালানি সংকটের বিপরীত প্রভাবও গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রযুক্তিতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা আবার ভিন্ন জায়গায় কেন্দ্রীভূত। স্ট্যানফোর্ডের ‘এআই ইনডেক্স ২০২৬’ অনুযায়ী, গবেষণাপত্র, উদ্ধৃতি ও পেটেন্টের সংখ্যায় চীন এগিয়ে; উন্নত মানের শীর্ষ এআই মডেল এবং বেশি প্রভাবশালী পেটেন্টে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব রয়েছে। প্রতিবেদনে তাইওয়ানের টিএসএমসির তৈরি চিপের ওপর এআই অবকাঠামোর গভীর নির্ভরতাও উঠে এসেছে। প্রযুক্তির ক্ষমতা কয়েকটি পরস্পরনির্ভর কেন্দ্রের মধ্যে ভাগ হচ্ছে।
বিনিয়োগেও এশিয়ার আকর্ষণ বড়। ইউএনসিটিএডের হিসাবে, উন্নয়নশীল এশিয়া ২০২৫ সালে ৬৪৪ বিলিয়ন ডলার প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছে, যা বৈশ্বিক প্রবাহের প্রায় ৪০ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পূর্ব এশিয়াকে ছাড়িয়ে অঞ্চলের বৃহত্তম বিনিয়োগগ্রহীতা উপঅঞ্চল হয়েছে। তবে বিনিয়োগ কেন্দ্রীভূত। উন্নয়নশীল বিশ্বের শীর্ষ ১০ গ্রহীতার আটটি এশিয়ায়। ফলে নতুন সুযোগ ধরতে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।

আর্থিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে ডলারের অবস্থান শক্ত। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের এপ্রিল ২০২৫-এর সমীক্ষায় বৈশ্বিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের ৮৯ দশমিক ২ শতাংশের এক পাশে ছিল ডলার। চীনের রেনমিনবির অংশ ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে এশিয়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়লেও আন্তর্জাতিক অর্থের ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বহাল থাকার শক্ত ভিত্তি রয়েছে।
শুল্কের রাজনীতির ব্যাখ্যায় কোয়াহ আরেকটি দিক সামনে আনেন। জুলাইয়ের প্রকাশিত বিশ্লেষণে তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে লাভবান হলেও ক্ষতি কিছু শ্রমিক ও শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। সেই ক্ষোভ জাতীয়তাবাদ ও সুরক্ষাবাদকে শক্তি দিয়েছে। তাই বর্তমান বাণিজ্যবাধার পেছনে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতার সঙ্গে দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাবও কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদ ঈশ্বর প্রসাদের ‘দ্য ডুম লুপ’ বইয়ের ব্রুকিংসে প্রকাশিত পরিচিতিতেও এই টানাপড়েন রয়েছে। তার ব্যাখ্যায় বিশ্বায়ন, বৈষম্য, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূরাজনীতি পরস্পরকে অস্থিতিশীল করছে। ভারত, ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়ার মতো মধ্যম শক্তির উত্থান বহুমেরু ব্যবস্থার সম্ভাবনা তৈরি করলেও যুক্তরাষ্ট্র–চীনের প্রতিযোগিতায় তাদের পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়ছে।
এশিয়ার পথেও ঝুঁকি রয়েছে। আইএমএফের অর্থনীতিবিদ আন্দ্রেয়া পেসকাতোরি ও কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন এপ্রিলের বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত জ্বালানি ধাক্কার কথা বলেছেন। তাদের হিসাবে এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের পাঁচ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে। আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সংযোগ বাড়ানো এবং জ্বালানি আমদানির নির্ভরতা কমানোকে তারা প্রস্তুতির অংশ করেছেন।
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন রপ্তানির সক্ষমতা বাড়ানো। বিশ্বব্যাংকের ফেব্রুয়ারির মূল্যায়নে দেশের রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। চামড়া, পাদুকা, হালকা প্রকৌশল ও প্লাস্টিকে সুযোগ থাকলেও প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক মান পূরণের ঘাটতি রয়েছে। এশিয়ার ক্রেতা ও সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হতে হলে এসব বাধা সরিয়ে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা এপ্রিলের মূল্যায়নে নিয়ন্ত্রণগত অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং ব্যবসার বিকাশের বাধা সরানোর ওপর জোর দিয়েছেন। ইউএনসিটিএডও বিনিয়োগের সুফল পেতে স্থানীয় সরবরাহকারী, দক্ষ কর্মী ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোর প্রয়োজন বলেছে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬