Loading...

অংশীদার দেশগুলোর জন্যে তৈরি হচ্ছে সুযোগ
চীনের মহাকাশ স্টেশন এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্যও ধরে এগোচ্ছে এবং একই সময়ে আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন প্রকল্পের কাঠামো তৈরি করছে।


পাকিস্তানের দুই পাইলট এখন চীনে নভোচারী হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। তাঁদের একজনকে চীনের তিয়ানগং মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হলে তিনিই হবেন সেখানে যাওয়া প্রথম বিদেশি নভোচারী।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিশান আলী ও খুররম দাউদ কয়েক মাস ধরে বেইজিংয়ের চায়না অ্যাস্ট্রোনট রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। দুজনের একজনকে শেষ পর্যন্ত তিয়ানগংয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য পাঠানোর কথা রয়েছে। তবে কে নির্বাচিত হবেন এবং ঠিক কোন অভিযানে তিনি যাবেন, সে সিদ্ধান্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
ঘটনাটিকে শুধু পাকিস্তানের প্রথম মানব মহাকাশযাত্রা হিসেবে দেখলে এর বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের মহাকাশ সহযোগিতা শুধু নভোচারী প্রশিক্ষণ দিয়ে শুরু হয়নি। গত কয়েক বছরে এই সম্পর্ক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, চীনের বেইদৌ উপগ্রহনির্ভর নেভিগেশন ব্যবস্থা, চন্দ্র অনুসন্ধান এবং এখন মানব মহাকাশযাত্রা পর্যন্ত পৌঁছেছে। অর্থাৎ সহযোগিতার পরিধি একটি প্রকল্প থেকে ধীরে ধীরে পুরো মহাকাশ ব্যবস্থায় বিস্তৃত হয়েছে।
এই পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল পাকিস্তানের চীনা সহায়তায় পৃথিবী পর্যবেক্ষণ উপগ্রহ কর্মসূচি। ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পাকিস্তান চীনের শিচাং উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে একটি দূর অনুধাবন উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে। উপগ্রহটির লক্ষ্য ছিল কৃষি, নগর পরিকল্পনা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, বন উজাড়, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার মতো কাজে উচ্চ-রেজল্যুশনের ছবি সরবরাহ করা।
২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল চীনের মানব মহাকাশ কর্মসূচি ঘোষণা করে যে দুই পাকিস্তানি প্রার্থীকে বিদেশি নভোচারী প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে একজনকে তিয়ানগংয়ে স্বল্পমেয়াদি মিশনে গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হবে। চীনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির মহাকাশ স্টেশন প্রথমবার কোনো বিদেশি নভোচারীকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এরও আগে, ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা সুপারকো এবং চীনের মানব মহাকাশ সংস্থার মধ্যে নভোচারী প্রশিক্ষণ ও চীনা মহাকাশ স্টেশনে পাকিস্তানি নভোচারী পাঠানোর আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়। চুক্তিতে দুই পাকিস্তানিকে প্রশিক্ষণ এবং তাঁদের একজনকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য মহাকাশ স্টেশনে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল।

চন্দ্র অনুসন্ধানের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান শুধু চীনের উৎক্ষেপণ সুবিধা ব্যবহারকারী নয়। সুপারকোর নিজস্ব তথ্যে বলা হয়েছে, প্রায় ৩৫ কেজি ওজনের একটি পাকিস্তানি চন্দ্রযান ২০২৮ সালে চীনের চ্যাং’অ-৮ অভিযানের অংশ হিসেবে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান চাঁদের মাটিতে নিজস্ব যন্ত্র পাঠানোর সুযোগ পাবে। চ্যাং’অ-৮ আবার চীনের বৃহত্তর আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত।
অর্থাৎ একই অংশীদারিত্বের মধ্যে এখন চারটি স্তর দেখা যাচ্ছে—পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, নেভিগেশন, মানব মহাকাশযাত্রা এবং চন্দ্র অনুসন্ধান। ২০২৬ সালের মে মাসে চীন ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতেও দুই দেশ মহাকাশ সহযোগিতা আরও গভীর করার কথা জানিয়েছে। সেখানে পাকিস্তানি নভোচারীকে চীনা মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো এবং শান্তিপূর্ণভাবে মহাকাশ সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে।
চীনের জন্যও এটি শুধু একটি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের একজন নভোচারীকে মহাকাশে পাঠানোর ঘটনা নয়। চীনের মহাকাশ স্টেশন এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহারের দিকে এগোচ্ছে। চীন ২০৩০ সালের মধ্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর লক্ষ্যও ধরে এগোচ্ছে এবং একই সময়ে আন্তর্জাতিক চন্দ্র গবেষণা স্টেশন প্রকল্পের কাঠামো তৈরি করছে। ফলে পাকিস্তানের মতো অংশীদার দেশগুলোকে পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে শুরু করে চন্দ্র অনুসন্ধান পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই জায়গায় দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ। ভারত নিজস্ব মানব মহাকাশ কর্মসূচি, চন্দ্র অভিযান ও উপগ্রহ ব্যবস্থায় এগিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান এখন চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে তার নিজস্ব মানব ও গভীর মহাকাশ সক্ষমতা গড়ে তুলছে। আর বাংলাদেশ এখনো মূলত যোগাযোগ উপগ্রহ, দূর অনুধাবন ও মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রয়োগের স্তরে রয়েছে।
বাংলাদেশের মহাকাশ প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান স্পারসোর সরকারি বর্ণনা অনুযায়ী, কৃষি, বন, পানি, পরিবেশ, সমুদ্র, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মানচিত্র তৈরিতে দূর অনুধাবন প্রযুক্তি ব্যবহারই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ।
২০২৬ সালের ৮ জুন প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা স্পারসোকে নিজস্ব উপগ্রহ উৎক্ষেপণ, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ, কৌশলগত মানচিত্র ও ভূস্থানিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে বলেন। ২০২৫ সালের আগস্টে স্পারসো এমন একটি সম্ভাব্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য পরামর্শকও নিয়োগ করেছে, যার আওতায় রকেট উৎপাদন ও উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, উপগ্রহ উৎপাদনশিল্প ও মহাকাশ শিল্পপার্কের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি বর্তমানে বাংলাদেশের একমাত্র যোগাযোগ উপগ্রহ বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ পরিচালনা করছে। এটি সম্প্রচার, ডিটিএইচ, ভিস্যাট এবং দূরবর্তী অঞ্চলে যোগাযোগসেবা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আগস্ট ২০২৬-এ স্যাটেলাইট কোম্পানি ও স্পারসোর মধ্যে মহাকাশ ও উপগ্রহ প্রযুক্তিতে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬