Loading...

পাচারের ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ
এক বছর আগেও মালয়েশিয়াগামী ৯২৫ কচ্ছপ উদ্ধার, এবারও একই গন্তব্য; পেছনে বড় কোনো পাচারচক্র আছে কি না, তদন্তে খুঁজছে বন বিভাগ।


ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ব্যাগে ১ হাজার ১৬৩টি জীবন্ত কড়ি কাইট্টা কচ্ছপ পাওয়ার ঘটনা নতুন করে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী পাচারের একটি অস্বস্তিকর দিক সামনে এনেছে। ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ৫৭ বছর বয়সী মো. শহীদুল ইসলাম মালয়েশিয়াগামী বাটিক এয়ারের একটি ফ্লাইটে উঠতে যাচ্ছিলেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার লাগেজে তল্লাশি চালিয়ে কচ্ছপগুলো উদ্ধার করা হয়। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অর্থের বিনিময়ে শুধু লাগেজ বহনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন। তদন্তকারীদের ধারণা, এর পেছনে আরও লোক থাকতে পারে। তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দর থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে।
ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু সংখ্যায় নয়। গন্তব্যটি মালয়েশিয়া এবং ঘটনার ধরনটি প্রায় এক বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরগামী এক যাত্রীর দুটি লাগেজে ৯২৫টি কচ্ছপ উদ্ধার হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে ৭৮০টি ছিল ইন্ডিয়ান রুফড টার্টল এবং ১৪৫টি ইন্ডিয়ান স্টার টরটয়েজ। সেবারও বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেছিলেন, কচ্ছপগুলো বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হচ্ছিল। যাত্রী তল্লাশির সময় পালিয়ে যায়।
দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় এক বছর। প্রথম ঘটনায় ৯২৫টি, এবার ১ হাজার ১৬৩টি। দুটি চালানেই কয়েক শ নয়, প্রায় হাজারখানেক বন্য কচ্ছপকে যাত্রীবাহী বিমানে মালয়েশিয়ায় নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে একই ব্যক্তি বা একই চক্র দুই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
এমন দাবির পক্ষে এখনো তদন্তভিত্তিক প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। কিন্তু পরপর দুই বছর একই বিমানবন্দর থেকে বিপুলসংখ্যক কচ্ছপের মালয়েশিয়ামুখী চালান ধরা পড়া অবশ্যই এমন একটি প্রশ্ন তৈরি করে যে, বাংলাদেশ কি এই বাণিজ্যে শুধু সংগ্রহের জায়গা, নাকি আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের জন্য একটি মধ্যবর্তী রুটও হয়ে উঠেছে।
এই প্রশ্নের আরেকটি সূত্র দেশের ভেতরেই পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট ভোলার চরফ্যাশনে বন বিভাগ ২৫০টি কচ্ছপ উদ্ধার করেছিল। চারটি বাঁশের ঝুড়িতে রাখা এসব কচ্ছপের মধ্যে ছিল ইন্ডিয়ান সফটশেল টার্টল এবং কড়ি কাইট্টা। কর্মকর্তারা বলেছিলেন, এগুলো পাচারের উদ্দেশ্যে জড়ো করা হয়েছিল।
পরে সব কচ্ছপই স্থানীয় জলাশয়ে অবমুক্ত করা হয়। অর্থাৎ বিমানবন্দরের ঘটনায় ধরা পড়া কচ্ছপগুলো যে দেশের কোথাও থেকে সংগ্রহ হয়ে আসছে, তার একটি সম্ভাব্য অভ্যন্তরীণ স্তর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধরা পড়া এমন চালানে দেখা যাচ্ছে। তবে ভোলার ওই চালানের সঙ্গে ঢাকার বিমানবন্দরের ঘটনার সরাসরি যোগ এখনো প্রমাণিত নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো কড়ি কাইট্টা আসলে কোন প্রজাতি। বাংলাদেশভিত্তিক স্বাদুপানির জীববৈচিত্র্য তথ্যভান্ডারে সাধারণ কড়ি কাইট্টাকে Pangshura tecta, অর্থাৎ ইন্ডিয়ান রুফড টার্টল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের ২০২৫ সালের আইইউসিএন রেড লিস্টে এই প্রজাতির দেশের অবস্থান ‘Least Concern’ বা কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই এটিকে “বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপ” বলে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না। কিন্তু কোনো প্রজাতি বৈশ্বিকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ হলেই বন্য থেকে ধরে বেচাকেনা বা দেশের বাইরে পাচার বৈধ হয়ে যায় না।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন, ২০১২ অনুযায়ী বন্যপ্রাণী আমদানি-রপ্তানিতে নির্দিষ্ট বন্দর, অনুমতি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিআইটিইএস সনদ প্রয়োজন। অর্থাৎ একটি বন্য কচ্ছপকে লাগেজে ভরে বিমানে তুলে অন্য দেশে নেওয়া নিছক যাত্রীর ব্যক্তিগত মালামাল বহনের বিষয় নয়; এর জন্য আইনগত অনুমতির কাঠামো রয়েছে।
এখানেই আন্তর্জাতিক বাজারের প্রশ্নটি আসে। দক্ষিণ এশিয়ার কচ্ছপ পাচার নিয়ে গবেষণায় বহু বছর ধরেই দেখা গেছে, ভারতীয় কচ্ছপ ও কাছিমের একটি অংশ অবৈধভাবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যায় এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক পোষা প্রাণীর বাজার বা অন্যান্য বাণিজ্যিক চ্যানেলে পৌঁছায়।
ভারতীয় কচ্ছপ পাচারের ওপর একটি গবেষণায় ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ৫৮ হাজারের বেশি জীবন্ত কচ্ছপ জব্দের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছিল; গবেষণায় বাংলাদেশকে এমন একটি গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেখানে ভারতীয় কচ্ছপ এনে পরে অন্য দেশে পাঠানোর ঘটনাও পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশকে ঘিরে আগের অনুসন্ধানেও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছিল, ভারত ও চীন থেকে আসা কিছু বিরল কচ্ছপ বাংলাদেশ হয়ে দুবাই, কাতার, ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পাচার করা হয়। তবে এসব উদাহরণ বর্তমান ১ হাজার ১৬৩ কড়ি কাইট্টার চালানের চূড়ান্ত গন্তব্যের বাজার বা ক্রেতাকে প্রমাণ করে না। বর্তমান মামলার তদন্ত থেকেই সেটি বের হওয়ার কথা।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬