Loading...

বিশ্বমানচিত্র বিতর্ক
পৃথিবী গোল, কিন্তু তাকে সমতল মানচিত্রে দেখাতে গেলেই শুরু হয় বিকৃতি। কোথাও কোনো দেশ বাস্তবের চেয়ে বড় দেখায়, কোথাও আবার একটি পুরো মহাদেশ ছোট হয়ে যায়। বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত বিশ্বমানচিত্রের এই অসামঞ্জস্য নতুন কিছু নয়। তবে এবার বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবকে ঘিরে। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তনকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরা। কিন্তু মানচিত্রের আকার ঠিক করতে গিয়েই সামনে এসেছে আরও জটিল প্রশ্ন।


পৃথিবী গোল, কিন্তু তাকে সমতল মানচিত্রে দেখাতে গেলেই শুরু হয় বিকৃতি। কোথাও কোনো দেশ বাস্তবের চেয়ে বড় দেখায়, কোথাও আবার একটি পুরো মহাদেশ ছোট হয়ে যায়। বহু শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত বিশ্বমানচিত্রের এই অসামঞ্জস্য নতুন কিছু নয়।
তবে এবার বিষয়টি নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবকে ঘিরে। লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন অঞ্চলের প্রকৃত আয়তনকে আরও সঠিকভাবে তুলে ধরা। কিন্তু মানচিত্রের আকার ঠিক করতে গিয়েই সামনে এসেছে আরও জটিল প্রশ্ন। বিতর্কিত ভূখণ্ডগুলো কোন দেশের রঙে দেখানো হবে, আর একটি মানচিত্র কতটা ভৌগোলিক, কতটা রাজনৈতিক?
আফ্রিকাকে আর ছোট করে দেখানো হবে না, উদ্দেশ্য ছিল মোটামুটি এটুকুই। কিন্তু জাতিসংঘে বিশ্বমানচিত্রের উপস্থাপন বদলানোর একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার পর বিতর্ক গিয়ে ঠেকেছে ক্রিমিয়া, কাশ্মীর ও কুরিল দ্বীপপুঞ্জে।
সমস্যা এখন শুধু পৃথিবীর কোন মহাদেশ মানচিত্রে কতটা বড় দেখায়, তা নয়। প্রশ্ন উঠেছে, কোন ভূখণ্ডকে কোন দেশের রঙে দেখানো হচ্ছে, কোথায় সীমারেখা টানা হচ্ছে এবং একটি মানচিত্র মানুষের রাজনৈতিক ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে কি না।
গত ৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ‘Correct the Map: Rebalancing Global Cartographic Representation’ প্রস্তাবটি ১৬৪-১ ভোটে পাস হয়। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র এর বিপক্ষে ভোট দেয়। আফ্রিকান গ্রুপের পক্ষে টোগো প্রস্তাবটি উত্থাপন করে।
প্রস্তাবটির মূল লক্ষ্য প্রচলিত মার্কেটর প্রজেকশনের বদলে এমন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, যেখানে বিভিন্ন মহাদেশের আপেক্ষিক আয়তন বাস্তবের কাছাকাছি থাকে। আফ্রিকান ইউনিয়নও এ ধরনের সমান-আয়তনভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এখানেই আসে ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের নাম।

২০১৮ সালে তৈরি এই প্রজেকশনের লক্ষ্য পৃথিবীর অঞ্চলগুলোর আপেক্ষিক আয়তনকে তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে দেখানো। কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহুল ব্যবহৃত মার্কেটর প্রজেকশনে মেরুর কাছাকাছি অঞ্চল বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ গ্রিনল্যান্ড ও আফ্রিকা।
প্রচলিত অনেক মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আয়তনের মনে হতে পারে। বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের প্রায় ১৪ গুণ বড়। একইভাবে ইউরোপ, কানাডা ও রাশিয়ার মতো উচ্চ অক্ষাংশের অঞ্চলগুলোও বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় বলে মনে হয়।
তবে মার্কেটর মানচিত্রকে স্রেফ ‘ভুল’ বলা ঠিক নয়। ১৫৬৯ সালে জেরার্ডাস মার্কেটর মূলত নৌ-চলাচলের সুবিধার জন্য এই প্রজেকশন তৈরি করেছিলেন। এতে দিক ও কোণ ধরে রাখা যায়, ফলে নাবিকদের জন্য নির্দিষ্ট পথে চলা সহজ ছিল। সমস্যা তৈরি হয় যখন নৌচলাচলের জন্য বানানো একটি প্রজেকশনকেই পৃথিবীর রাজনৈতিক ও শিক্ষামূলক মানচিত্রের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মানচিত্রের গণিত ঠিক করতে গিয়েই নতুন প্রশ্ন শুরু হয়েছে।
ইউক্রেন, ভারত ও জাপানের আপত্তি ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের মূল ধারণার বিরুদ্ধে নয়। তাদের আপত্তি বিতর্কিত ভূখণ্ডগুলো কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে। ইউক্রেনের উদ্বেগ ক্রিমিয়া নিয়ে। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা ক্রিমিয়াকে এমনভাবে রঙ করা হয়েছে, যা ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের চেয়ে আলাদা এবং রাশিয়ার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে কিয়েভের অভিযোগ। ইউক্রেন বলছে, এতে ক্রিমিয়ার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
জাপানের আপত্তি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা চারটি দ্বীপ নিয়ে, যেগুলোকে টোকিও ‘নর্দার্ন টেরিটোরিজ’ বলে দাবি করে। রাশিয়া এগুলোকে দক্ষিণ কুরিল দ্বীপপুঞ্জের অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করছে। মানচিত্রে দ্বীপগুলোকে রাশিয়ার একই রঙে দেখানো হলে সেটি মস্কোর দাবি স্বীকৃতির মতো মনে হতে পারে বলে জাপানের আপত্তি।
ভারতের ক্ষেত্রে বিতর্ক জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ নিয়ে। নয়াদিল্লি বলছে, ভারতের দাবিকৃত ভূখণ্ড অবশ্যই তাদের সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে। অন্যভাবে উপস্থাপন করা হলে সেটি সার্বভৌমত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি পরিষ্কার করা দরকার।
জাতিসংঘ কোনো নতুন আন্তর্জাতিক সীমান্ত তৈরি করেনি। কোনো বিতর্কিত ভূখণ্ডের মালিকানাও বদলায়নি। সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবটি এমন কোনো আন্তর্জাতিক আইন নয়, যা সদস্যরাষ্ট্রকে বাধ্য করবে নির্দিষ্ট একটি মানচিত্র ব্যবহার করতে।

টোগোর প্রতিনিধিও ভোটের সময় পরিষ্কার করেছিলেন, প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য মহাদেশগুলোর আপেক্ষিক আয়তনকে সঠিকভাবে তুলে ধরা। সীমান্ত, সার্বভৌমত্ব কিংবা ভূখণ্ডের আইনি মর্যাদা নির্ধারণ এর লক্ষ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কোনো বিতর্কিত ভূখণ্ডের ওপর কারো দাবি স্বীকৃতি দেয় না।
তারপরও মানচিত্রের রঙ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
কারণ মানচিত্র শুধু ভৌগোলিক তথ্যের কাগজ নয়। রাষ্ট্রগুলো বহুদিন ধরেই নিজেদের ভূখণ্ডগত দাবি প্রতিষ্ঠার একটি প্রতীকী উপকরণ হিসেবে মানচিত্র ব্যবহার করে। স্কুলের বই, সংবাদমাধ্যম, সরকারি নথি কিংবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে একটি অঞ্চল কীভাবে দেখানো হচ্ছে, সেটি মানুষের রাজনৈতিক ধারণা তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও অতীতে বলেছে, মানচিত্র সাধারণত সীমান্ত নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। এর মূল্য নির্ভর করে কে মানচিত্রটি তৈরি করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো সেটি গ্রহণ করেছে কি না।
অর্থাৎ একটি মানচিত্রে কোনো ভূখণ্ডকে একটি দেশের রঙে দেখানো মানেই সেই দেশের আইনি মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া নয়। কিন্তু কূটনীতিতে প্রতীকও কখনো কখনো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
আফ্রিকার জন্য পুরো উদ্যোগটির গুরুত্ব আরও গভীর। দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকান দেশগুলোর অভিযোগ, প্রচলিত মানচিত্র পৃথিবীর বৃহত্তম মহাদেশগুলোর একটিকে বাস্তবের তুলনায় ছোট দেখিয়ে এসেছে। এর ফলে শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের ভৌগোলিক ধারণাতেও অসমতা তৈরি হয়েছে।
সেই অর্থে ‘Correct the Map’ শুধু কার্টোগ্রাফির বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জ্ঞান, প্রতিনিধিত্ব ও ঔপনিবেশিক যুগের মানচিত্র-চর্চার উত্তরাধিকার। কিন্তু নতুন বিতর্ক দেখিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর আকার সঠিকভাবে আঁকা যতটা গাণিতিক কাজ, রাজনৈতিক পৃথিবীকে মানচিত্রে আঁকা ততটা সহজ নয়।
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন দেখাতে চাইলে গণিত যথেষ্ট। কিন্তু ক্রিমিয়া, কাশ্মীর কিংবা কুরিল দ্বীপপুঞ্জ কোন রঙে থাকবে, সেখানে গণিতের জায়গা দ্রুত নিয়ে নেয় ভূরাজনীতি।
নবোদয়/ এসএন/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬