Loading...

ব্রহ্মপুত্র আবার বাণিজ্যপথ
উনিশ শতকে আসাম ও বাংলার মধ্যে নদীপথে চা, কাঠ, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন হতো। স্টিমার চলাচলের মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে আসামের বাণিজ্যিক সংযোগও গড়ে উঠেছিল। সড়ক ও রেলপথের বিস্তার এবং পরে দেশভাগের ফলে সেই কাঠামো ভেঙে যায়।


একসময় ব্রহ্মপুত্র ছিল আসাম ও বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান যোগাযোগপথ। চা, কয়লা, কাঠসহ নানা পণ্য এই নদীপথে আসাম থেকে বাংলার দিকে যেত। উনিশ শতকে কলকাতার সঙ্গে আসামের বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে ওঠার পেছনেও এই নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পরে সড়ক ও রেলপথের বিস্তার, দেশভাগ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার পরিবর্তনে সেই পুরোনো নদীপথের বাণিজ্যিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। প্রায় আট দশক পর এবার সেই পথেই আবার বাংলাদেশমুখী পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আসামের ডিব্রুগড় অঞ্চল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে বাংলাদেশে মোট ১ হাজার ৮০ টন মিথানল পাঠানোর জন্য দুটি নৌযানের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা। আসাম পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান বিকুল ডেকার ভাষ্য অনুযায়ী, ভারতের স্বাধীনতার পর ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশে এই নদীপথে পণ্য পাঠানোর ঘটনা এবারই প্রথম। দুটি নৌযান আসাম সরকারের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন বিভাগের কাছ থেকে ইজারা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি নৌযানে ২৭টি করে কনটেইনার থাকবে এবং প্রতিটি কনটেইনারে থাকবে ২০ টন মিথানল।
পণ্যগুলো প্রথমে বগীবিলের নতুন অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন টার্মিনালে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ব্রহ্মপুত্র ধরে যাত্রা শুরু করবে নৌযান দুটি। বগীবিল থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৭৮৩ কিলোমিটার। এ পথ পাড়ি দিতে সময় লাগতে পারে প্রায় সাত দিন।
ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু একটি নতুন পণ্য চালানে নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বাংলাদেশের মধ্যে নদীপথে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা সামনে এসেছে। এই জলপথের বড় অংশ ভারতের জাতীয় জলপথ-২-এর অন্তর্ভুক্ত। ব্রহ্মপুত্রের ধুবড়ি থেকে সাদিয়া পর্যন্ত প্রায় ৮৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীপথকে ভারত ১৯৮৮ সালে জাতীয় জলপথ হিসেবে ঘোষণা করে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ নৌপথ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে নিমাতি পর্যন্ত অংশে প্রায় ২ দশমিক ৫ মিটার, নিমাতি থেকে ডিব্রুগড় পর্যন্ত প্রায় ২ মিটার এবং ডিব্রুগড় থেকে সাদিয়া পর্যন্ত অংশে প্রায় ১ দশমিক ৫ মিটার নাব্যতা বজায় রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এবার যে পথে বাণিজ্যিক পণ্য পাঠানো হচ্ছে, সেটি সম্পূর্ণ নতুন কোনো যোগাযোগপথ নয়; বরং বহু বছর ধরে উন্নত করা একটি নদীপথকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বেশি ব্যবহার করার চেষ্টা।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নদীপথে পণ্য পরিবহনের কাঠামোটিও নতুন নয়। ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ও বাণিজ্য প্রটোকল দুই দেশের নির্ধারিত নদীপথে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে এই কাঠামোয় নতুন নৌপথ ও পণ্য ওঠানামার বন্দর যুক্ত হয়েছে। ২০২০ সালে প্রটোকলের দ্বিতীয় সংযোজনের মাধ্যমে শিলঘাট–পান্ডু–ধুবড়ি–চিলমারি–বাহাদুরাবাদ–সিরাজগঞ্জ–আরিচাসহ কয়েকটি রুটকে আরও কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ ডিব্রুগড় থেকে বাংলাদেশমুখী এই চালান কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই থাকা নদীপথ বাণিজ্যব্যবস্থাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব প্রয়াস। এতদিন এই আন্তর্জাতিক নদীপথে ভারতীয় ট্রানজিট পণ্য, বাংলাদেশমুখী শিল্পপণ্য এবং বিভিন্ন ধরনের ভারী ও বাল্ক পণ্য পরিবহন হয়েছে।
ভারতের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ-ভারত প্রটোকলভুক্ত নৌপথে প্রায় ৪৬ লাখ টন পণ্য পরিবহন হয়েছে। এর মধ্যে কয়লা, খাদ্যপণ্য, ফ্লাই অ্যাশ, বড় আকারের প্রকল্প কার্গো, গম, চাল, ভুট্টা, পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য ছিল।
তবে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য এই নদীপথের গুরুত্ব আরও বড়। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের স্থল যোগাযোগে দীর্ঘদিন ধরে শিলিগুড়ি করিডর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্রহ্মপুত্র এবং বাংলাদেশ হয়ে নৌপথের ব্যবহার বাড়াতে পারলে এই একটি মাত্র স্থলপথের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর বিকল্প তৈরি হতে পারে। জাতীয় জলপথ-২-এ ধুবড়ি ও পান্ডুতে স্থায়ী টার্মিনালের পাশাপাশি একাধিক ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। বগীবিলসহ বিভিন্ন স্থানে টার্মিনাল উন্নয়নের কাজও চলছে।
এখানে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সরাসরি সমুদ্রবন্দরনির্ভর নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ নদী ও সমুদ্রবন্দরসমৃদ্ধ একটি দেশ। ফলে ব্রহ্মপুত্র হয়ে আসা পণ্য যদি বাংলাদেশের নদীপথে নিয়মিতভাবে প্রবেশ করতে পারে, তাহলে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বাংলাদেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাওয়ার একটি বিকল্প সরবরাহপথ আরও কার্যকর হতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় রয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের নৌপথ সংযোগে নাব্যতা ও নৌচলাচল অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।
তবে এই সম্ভাবনার সামনে সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ ব্রহ্মপুত্রের নাব্যতা। ব্রহ্মপুত্রের চরিত্র মৌসুমভেদে ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। বর্ষায় নদীর পানিপ্রবাহ ও গভীরতা বাড়লেও শুষ্ক মৌসুমে চর জাগা, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং গতিপথের পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ফলে বাণিজ্যিক নৌপথকে বছরজুড়ে সচল রাখতে নিয়মিত নদী খনন, নাব্যপথ উন্নয়ন এবং নৌচলাচল সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়। সড়ক বা রেলপথের কার্যকর বিকল্প হিসেবে নদীপথকে দাঁড় করাতে হলে নির্দিষ্ট গভীরতার নৌযানকে সারা বছর নির্ভরযোগ্যভাবে চলাচলের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তাই দুটি নৌযানে ১ হাজার ৮০ টন মিথানলের এই চালানকে শুধু একটি পণ্য পরিবহনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বড় দিকটি আড়ালে থেকে যাবে। এর পরের ধাপে একই নদীপথে মিথানল, সার, খাদ্যশস্য, কয়লা, শিল্পের কাঁচামাল বা অন্যান্য পণ্য কতটা নিয়মিতভাবে পরিবহন করা যায়, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।
বগীবিল থেকে ধুবড়ি, সেখান থেকে বাংলাদেশের নদীবন্দর এবং এরপর দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার—এই পুরো সরবরাহব্যবস্থা যদি সময় ও খরচের দিক থেকে নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি সীমান্তপারের নদী নয়, উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডরে পরিণত হতে পারে।
ইতিহাসও এই সম্ভাবনার পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করে। উনিশ শতকে আসাম ও বাংলার মধ্যে নদীপথে চা, কাঠ, কয়লা ও অন্যান্য পণ্য পরিবহন হতো। স্টিমার চলাচলের মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে আসামের বাণিজ্যিক সংযোগও গড়ে উঠেছিল। সড়ক ও রেলপথের বিস্তার এবং পরে দেশভাগের ফলে সেই কাঠামো ভেঙে যায়।
প্রায় আট দশক পর ব্রহ্মপুত্রকে ঘিরে সেই পুরোনো বাণিজ্যিক সংযোগ নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসছে। এবারের মিথানলবাহী দুটি নৌযান তাই কেবল একটি চালানের সূচনা নয়; এটি পরীক্ষা করছে, বহু পুরোনো এই নদীপথকে কি আবার ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক করিডরে রূপ দেওয়া সম্ভব।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬