Loading...

‘ককরোচ’ আন্দোলন
‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ নামের এই কর্মসূচিকে গত সপ্তাহে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে ঘোষণা করেছিল সিজেপি। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।


ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ এবং তরুণদের ধারাবাহিক বিক্ষোভ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার, ১০ অক্টোবর, নয়াদিল্লিতে সমাবেশের ডাক দেয় যুব আন্দোলনের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। কর্মসূচি ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সংগঠনটির নেতাসহ বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ।
‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ নামের এই কর্মসূচিকে গত সপ্তাহে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিক্ষোভের সবচেয়ে বড় আয়োজন হিসেবে ঘোষণা করেছিল সিজেপি। তাদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে কমিশন ও বিজেপি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর। সংবাদপত্রটি জানায়, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অজ্ঞাতে নেওয়া হয়েছে। আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে ভোটার নিবন্ধন, তালিকা সংশোধন এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে।
কমিশনের বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কুমার ব্যক্তিগতভাবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয়ে মন্তব্য করেননি। বিরোধীরা অবশ্য এই মতবিরোধকে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার ভিত্তি হিসেবে সামনে এনেছে। তাদের দাবি, তালিকা সংশোধনের রাজনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, যাচাই প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ ভোটার অন্যত্র চলে গেছেন, ৩ কোটি ভোটারের সন্ধান পাওয়া যায়নি এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার মারা গেছেন। কমিশন বলছে, ভুলবশত বাদ পড়া ব্যক্তিরা আবার নিবন্ধিত হতে পারবেন।
বিরোধীদের অভিযোগ, বৈধ ভোটারের নামও বাদ পড়েছে এবং এই প্রক্রিয়া সম্প্রতি বিজেপির জেতা কয়েকটি রাজ্যের নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেছে। বিজেপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, মোদির জনপ্রিয়তা ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই দলটির নির্বাচনী সাফল্যের প্রধান কারণ। দলটির পাল্টা অভিযোগ, নির্বাচনে জিততে না পেরে বিরোধীরা জনগণকে বিভ্রান্ত করছে।
এই বিরোধের মধ্যেই শনিবার দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। কেন্দ্রীয় এলাকায় মেট্রো স্টেশন ও বাজার বন্ধের পাশাপাশি মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ স্থগিত করা হয়। শহরে প্রবেশের বিভিন্ন পয়েন্টে বাস, গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনে তল্লাশি চলে। সড়কে ব্যারিকেড ও কংক্রিটের ব্লক বসানো হয়, গুরুত্বপূর্ণ পথে মোতায়েন করা হয় দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মধ্য দিল্লিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে এবং অনেককে বাসে তুলে সরিয়ে নেয়। তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার মধ্যেও আরও বিক্ষোভকারী সেখানে আসতে থাকেন। আটক হওয়ার সময় যোগেন্দ্র সোলাঙ্কি নামে এক বিক্ষোভকারী রয়টার্সকে বলেন, “এটি জনগণের অধিকার লঙ্ঘন। দেশ আর এটা সহ্য করবে না।”
সিজেপি জানিয়েছে, মুম্বাই থেকে দিল্লি পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজের ভেতর থেকে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয়। টেলিভিশনের দৃশ্যে দীপকে গ্রেপ্তার হতে প্রস্তুত থাকার কথা জানান। এক পুলিশ কর্মকর্তা জবাবে বলেন, এটি গ্রেপ্তার নয় এবং তাঁদের সহযোগিতা করতে বলেন। সিজেপি ঘটনাটিকে সমাবেশের নেতৃত্ব অকার্যকর করার পূর্বপরিকল্পিত চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছে।

বিক্ষোভকারীদের সকাল ১০টায় যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধে কর্মসূচি বিলম্বিত হয়। শুক্রবার দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিজেপি সমাবেশকে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করে কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং আটক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দাবি করে।
দুটি ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা এক্সে জানিয়েছেন, বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁদের চার সাংবাদিক আটক হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের বাইরে প্রতিবাদরত কয়েকজন আইনজীবীকেও আটকের কথা জানিয়েছেন আদালতের বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। এসব আটকের বিষয়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিজেপির আন্দোলন ইতিমধ্যে মোদি সরকারের ওপর চাপ তৈরির নজির রেখেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিক্ষোভের পর গত জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। সংগঠনটির সমর্থকেরা একে রাজনৈতিক দলের চেয়ে চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে দেখেন। এবার তাদের দাবির কেন্দ্রে এসেছে নির্বাচন কমিশনের নেতৃত্ব।
২০২৭ সালে ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা, যার মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরপ্রদেশ। সেই নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধী দল ও তরুণদের একযোগে প্রতিবাদ মোদি সরকারের জন্য চাপ বাড়িয়েছে। কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ, ভোটারদের পুনর্নিবন্ধনের সুযোগ এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ—সবই এখন এই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬