Loading...

এমপি নজরুলের সাথে আপসনামা দাখিল
মেয়ের মৃত্যুর পর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ করেছিলেন মরিয়মের বাবা। ১০ দিনের মাথায় তার অবস্থান বদলে গেছে। আদালতে আপসনামা দাখিল করেছন।


মেয়ের মৃত্যুর পর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ করেছিলেন মরিয়মের বাবা। ১০ দিনের মাথায় তার অবস্থান বদলে গেছে। আদালতে আপসনামা দাখিল করেছন। তাতে তিনি বলেন, মামলা করেছিলেন সন্দেহের বশে; আসামিদের প্ররোচনায় মেয়ের মৃত্যু হয়নি। তবে আদালত তা গ্রহণ করেননি বলে জানিয়েছেন পিপি। এছাড়া নজরুলের জামিনও হয়নি।
এর ছয় দিন আগে বারিধারায় গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানের মৃত্যুর মামলায় ৯ লাখ টাকার আপসের ঘটনা সামনে আসে। সেই মামলাও শেষ হয়নি। দুটি ঘটনায় সমঝোতার ধরন আলাদা হলেও আইনগত প্রশ্নটি অভিন্ন। পরিবারের আপস কি মৃত্যুর ঘটনায় ফৌজদারি দায় নির্ধারণের বিকল্প হতে পারে?
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ আপসনামা দাখিল করেন। নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের জামিনে আপত্তি নেই বলে জানান তিনি। আদালত মাকসুদার জামিন মঞ্জুর করলেও নজরুলের আবেদন নামঞ্জুর করেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার ন্যাম ভবনের বাসা থেকে ১৯ বছর বয়সি মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার হয়। এজাহারে তার বাবা অভিযোগ করেন, বিয়ের পর নজরুল ও মাকসুদা তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতেন। মরিয়ম বিভিন্ন সময়ে ফোনে পরিবারকে সে কথা জানিয়েছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। মামলায় মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকেও আসামি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখন তদন্তাধীন।
অন্যদিকে আপসনামায় বলা হয়েছে, বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে বাদী নিশ্চিত হয়েছেন, নজরুল বা মাকসুদার প্ররোচনায় মরিয়মের মৃত্যু হয়নি। দুই পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে সমঝোতা হয়েছে। এতে জামিনে অনাপত্তি, সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিচার কার্যক্রমে সহযোগিতার শর্ত রয়েছে। তবে এঘটনায় টাকার লেনদেনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী গণমাধ্যমকে বলেন, এই মামলা আপসযোগ্য নয়; তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদন দেবেন এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি আপসনামাটি চাপের মুখে তৈরি হওয়ার অভিযোগও করেন এবং বিষয়টি তদন্তে খতিয়ে দেখার কথা বলেন।
মাকসুদার জামিনের কারণ নিয়েও দুই পক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে। ফারুকীর ভাষ্য, বয়স ও অসুস্থতা বিবেচনায় জামিন হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, আদালত আপসনামা আংশিক গ্রহণ করেছেন। তবে কোনো পক্ষের বক্তব্যেই মামলার নিষ্পত্তি বা আসামিদের খালাসের তথ্য নেই।

আইন অনুযায়ী, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারার বিষয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় যেসব অপরাধ আপসযোগ্য, তার তালিকায় ৩০৬ ধারা নেই। ফলে ব্যক্তিগত সমঝোতা দিয়ে এই অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি করা যায় না।
বারিধারার ঘটনায় অর্থের সঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের শর্তও ছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর গাড়িচাপায় মেহেদীর মৃত্যুর পর ২৪ সেপ্টেম্বর আদালতে আপসের তথ্য তুলে ধরেন অভিযুক্ত কিশোরের আইনজীবী আলমগীর হোসেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দাফন-কাফনের জন্য এক লাখ এবং বৃদ্ধ মা-বাবার ভবিষ্যতের জন্য আট লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। আপসনামায় মামলা প্রত্যাহারে ব্যবস্থা নেওয়া, জামিনে অনাপত্তি জানানো এবং প্রত্যাহারের ব্যয় গাড়ির মালিকপক্ষের বহনের শর্ত রয়েছে।
সেই সমঝোতায় নিহতের সব স্বজন একমতও নন। মেহেদীর চাচাতো ভাই আল আমিন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা টাকার বিনিময়ে রফাদফা চাই না। প্রকৃত দোষীর শাস্তি চাই।’ তার ফুফাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয়ও সঠিক বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
আদালত ২৪ সেপ্টেম্বর কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠান। ২৭ সেপ্টেম্বর জামিন শুনানিতে বিচারক বলেন, মামলার ধারা আপসযোগ্য নয়। অধিকতর শুনানির জন্য ৪ অক্টোবর দিন ধার্য করা হয়। সড়ক পরিবহণ আইনের ১১৭ ধারাতেও নির্দিষ্ট কয়েকটি অপরাধে আপসের সুযোগ রয়েছে; বেপরোয়া চালনায় মৃত্যুসংক্রান্ত ১০৫ ধারা সেই তালিকায় নেই।
মানুষের মৃত্যুর পর অর্থ দিয়ে পরিবারকে সহায়তা করা এবং অভিযুক্তের ফৌজদারি দায় নির্ধারণ—আইনে দুটি পৃথক বিষয়। মেহেদীর মামলায় অর্থের পাশাপাশি বিচার চেয়েছেন স্বজনেরা। মরিয়মের মামলায় অর্থ লেনদেনের তথ্য নেই, আছে অভিযোগ বদল ও রাষ্ট্রপক্ষের চাপের অভিযোগ। উভয় ক্ষেত্রেই আপসের পরও বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান। ক্ষতিপূরণ বা আত্মীয়তার সমঝোতায় অপরাধ প্রমাণ কিংবা দায়মুক্তির প্রশ্নটির নিষ্পত্তি হয়নি।
নবোদয়/ এসএন/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬