Loading...

মানবপাচার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
এই পরিসংখ্যান অপরাধের ব্যাপ্তি ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে মামলার সংখ্যা দিয়ে মোট ভুক্তভোগী কিংবা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। একটি মামলায় একাধিক ভুক্তভোগী ও আসামি থাকতে পারেন। আবার বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার সব অভিযোগ মানবপাচারের মামলা হিসেবেও নথিভুক্ত হয় না।


উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে বিদেশে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, মানবপাচার ও নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশে উদ্বেগজনক বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। ইউরোপে পাঠানোর প্রতিশ্রুতিতে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের অন্য দেশে আটকে রাখা, জোরপূর্বক কাজ করানো এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
সম্প্রতি বিদেশে আটকে পড়া দুই নারীর নির্যাতনের ভিডিওবার্তার সূত্র ধরে মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা মোহাম্মদ আরজু রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত দুই বছরে এমন অপরাধে কতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, কতজন ভুক্তভোগী উদ্ধার পেয়েছেন, তাদের অর্থ কতটা ফেরত এসেছে এবং একই ধরনের প্রতারণা বারবার ঘটছে কেন?
মামলা আছে, বিচার শেষ হচ্ছে কতটা?
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৫৮৯টি মানবপাচারের মামলা হয়। ২০২৫ সালে নতুন মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১২৬। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত পুরোনো ও নতুন মিলিয়ে ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা তদন্তাধীন অথবা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩০৬টি বিচারাধীন এবং ১ হাজার ৯৭৮টির তদন্ত চলছিল।
এই পরিসংখ্যান অপরাধের ব্যাপ্তি ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে মামলার সংখ্যা দিয়ে মোট ভুক্তভোগী কিংবা গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। একটি মামলায় একাধিক ভুক্তভোগী ও আসামি থাকতে পারেন। আবার বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার সব অভিযোগ মানবপাচারের মামলা হিসেবেও নথিভুক্ত হয় না।
বিচারের ফলাফলও প্রশ্ন তৈরি করছে। ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ৩৬৩টি মানবপাচার মামলার মধ্যে ৩৪২টিতে আসামিরা খালাস পান। ২০২৫ সালে নিষ্পত্তি হওয়া ২৪৫টি মামলার মধ্যে ২৩৬টিতে খালাস হয়। ওই বছর এসব মামলায় ৮৫৭ জন আসামি খালাস পান।
খালাসের এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে, সব অভিযোগ সত্য ছিল। তবে বিপুলসংখ্যক মামলায় দোষী সাব্যস্ত করার মতো প্রমাণ পাওয়া না যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের মান, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ ও বিচারপ্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বিদেশে আটকে থাকা ও দেশে ফেরার লড়াই
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের দুর্ভোগ শুধু বিদেশে আটকে থাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। দেশে ফিরলেও তাদের অনেককে ঋণ পরিশোধ, পরিবারের আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এবং নতুন কর্মসংস্থান খুঁজে পাওয়ার সংগ্রাম করতে হয়।
বিদেশে চাকরির আশায় দালালকে লাখ লাখ টাকা দিয়ে অনেকে ঋণ করেন কিংবা পরিবারের জমি ও সঞ্চয় বিক্রি করেন। প্রতিশ্রুত চাকরি না পেয়ে দেশে ফিরলে তাঁদের সামনে থাকে ঋণের বোঝা এবং সামাজিক চাপ। অন্যদিকে, বিদেশে আটকে থাকা ব্যক্তিদের উদ্ধারে প্রয়োজন হয় সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা।

সাম্প্রতিক আরজু রহমানের ঘটনায়ও কয়েকজন ভুক্তভোগী বিদেশ থেকে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। আরও কয়েকজন বিদেশে আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। তার গ্রেপ্তারের পর ৩০ থেকে ৩৫ জন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং আরও প্রায় ৩০০ জনের বিষয়ে খোঁজ রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এগুলো ওই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর হিসাব; দেশের সামগ্রিক চিত্র নয়।
টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই
প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের জন্য অর্থ ফেরত পাওয়া অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
টিবিএসের ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএমইটি ২ হাজার ৫৪টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করে প্রায় ৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করে। ২০২৪ সালে ১ হাজার ৭৫৫টি অভিযোগ নিষ্পত্তির মাধ্যমে ফেরত পাওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
তবে এই অর্থের হিসাব বিদেশগামী কর্মীদের বিভিন্ন অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত; এটি শুধু মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের ফেরত পাওয়া অর্থ নয়। ফলে মানবপাচারের ঘটনায় গত দুই বছরে মোট কত টাকা উদ্ধার হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক হিসাব আলাদাভাবে প্রয়োজন।
অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হলেই ভুক্তভোগীর টাকা ফেরত আসে না। অর্থের লেনদেনের প্রমাণ সংগ্রহ, ব্যাংক হিসাব ও সম্পদ শনাক্ত করা এবং আদালতের আদেশ কার্যকর করা জরুরি। প্রতারকেরা টাকা অন্যের হিসাবে সরিয়ে ফেললে কিংবা নগদে লেনদেন করলে তা উদ্ধার আরও কঠিন হয়।
কেন বারবার প্রতারণার শিকার মানুষ?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও প্রকাশিত ঘটনাগুলোতে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। প্রথমত, দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাব এবং দ্রুত আয় বাড়ানোর প্রত্যাশা মানুষকে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির দিকে আকৃষ্ট করে। এই আকাঙ্ক্ষাকে কাজে লাগিয়ে প্রতারকেরা ইউরোপে চাকরি, সহজ ভিসা কিংবা অল্প সময়ে বিদেশে পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
দ্বিতীয়ত, পরিচিতজন বা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে প্রস্তাব এলে অনেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ভিসা ও এজেন্সির বৈধতা যাচাই করেন না। পরিচিতির সূত্রে তৈরি বিশ্বাস তাদের ঝুঁকি সম্পর্কে অসতর্ক করে তোলে।
তৃতীয়ত, অনিয়মিত পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা পাচারকারীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। অন্য কেউ ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপে পৌঁছেছেন—এমন অভিজ্ঞতা শুনে অনেকে একই পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু যাত্রাপথে তাঁদের প্রতারণা, আটক, নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চতুর্থত, দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, বিদেশ থেকে প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতা এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মামলা পরিচালনার খরচ ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে কোনো কোনো ভুক্তভোগী আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন না।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ কী?
ব্র্যাকের অভিবাসন ও যুব কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেছেন, অনিয়মিত অভিবাসন এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া মানবপাচার মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরণার্থী ও অভিবাসী আন্দোলনবিষয়ক গবেষণা ইউনিটের (রামরু) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকীও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনালের সীমিত উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তার মতে, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
এসব বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, শুধু অভিযান ও গ্রেপ্তার বাড়িয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রতারণার অর্থের উৎস শনাক্ত, দ্রুত তদন্ত, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।
প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি
বিদেশে চাকরির প্রস্তাব গ্রহণের আগে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ভিসা, এজেন্সির অনুমোদন এবং চুক্তির শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দালালের মাধ্যমে অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে বৈধ ও নথিভুক্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। সন্দেহজনক প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
অন্যদিকে, সরকারের দায়িত্ব শুধু ভুক্তভোগীদের দেশে ফিরিয়ে আনা নয়; তাদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। মানবপাচারের মামলা, গ্রেপ্তার, সাজা, খালাস, উদ্ধার এবং অর্থ ফেরতের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে অপরাধ মোকাবিলার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬