Loading...

দেশে ফেসবুকের ৬.৪ কোটি সম্ভাব্য দর্শক
১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে মেটার বিজ্ঞাপনের বিল স্থানীয়ভাবে বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ চালু হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশি ব্যবসাগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা-সুবিধাযুক্ত কার্ড ব্যবহার করতে হতো। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি বড় বাস্তব বাধা ছিল, বিশেষ করে ছোট ব্যবসা ও নতুন বিজ্ঞাপনদাতাদের ক্ষেত্রে।


বাংলাদেশে মেটার অফিস খোলার আলোচনা এবার নতুন পর্যায়ে উঠেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে মেটার চিফ গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স অফিসার জোয়েল কাপলানের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে অফিস খোলার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। বৈঠকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মতো মেটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশের ব্যবসা, উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বাড়ানো, ই-কমার্স সম্প্রসারণ, শিক্ষা খাতে সহযোগিতা এবং অনলাইন হয়রানি মোকাবিলার বিষয়ও আলোচনায় আসে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এটি সরাসরি আমন্ত্রণ, আর শামা ওবায়েদের ভাষ্য অনুযায়ী মেটার পক্ষ থেকেও ঢাকায় একটি ‘ফোকাল পয়েন্ট’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। তবে এখনো অফিস কোথায় হবে, কবে চালু হবে বা কতজন কর্মী নিয়ে কার্যক্রম শুরু হবে এসব বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আলোচনার শুরু ২৩ সেপ্টেম্বরের বৈঠক দিয়ে নয়। এর প্রায় এক মাস আগে ১৩ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে মেটার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। সেখানে স্থানীয় কার্যালয়ের পাশাপাশি বাংলাদেশে মেটার কনটেন্ট ডেলিভারি নেটওয়ার্ক বা এজ নোড স্থাপন, স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণের মতো বিষয় আলোচনায় আসে। বিটিআরসি জানিয়েছিল, বাংলাদেশে মেটার সেবার ব্যবহারকারী বিপুল হওয়ায় স্থানীয় অবকাঠামো তৈরি হলে সেবার গতি ও স্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। মেটার প্রতিনিধিরা এসব বিষয়ে কারিগরি ও আইনগত দিক পর্যালোচনার কথা জানিয়েছিলেন। অর্থাৎ গত কয়েক সপ্তাহে আলোচনার কেন্দ্র শুধু ‘অফিস খুলবে কি না’ থেকে সরে স্থানীয় অবকাঠামো, পেমেন্ট, ব্যবসা ও কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার মতো বাস্তব বিষয়েও পৌঁছেছে।
মেটার কাছে বাংলাদেশের বাজার কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় কোম্পানির বিজ্ঞাপন-তথ্য থেকে। ডেটারিপোর্টালের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ প্রতিবেদনে মেটার বিজ্ঞাপন সরঞ্জামের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিকে বাংলাদেশে ফেসবুকে সম্ভাব্য বিজ্ঞাপন-দর্শকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ কোটি ৪০ লাখ। এটি দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৭৭ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। তবে এটি সক্রিয় ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট সংখ্যা নয়; মেটার বিজ্ঞাপন ব্যবস্থার সম্ভাব্য পৌঁছানোর হিসাব। ফলে শামা ওবায়েদের উল্লেখ করা প্রায় ৮ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যাকে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সরকারি বা চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে ধরা ঠিক হবে না।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য মেটার গুরুত্ব শুধু ব্যবহারকারীর সংখ্যায় নয়, ব্যবসার ক্ষেত্রেও। ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে মেটার বিজ্ঞাপনের বিল স্থানীয়ভাবে বিকাশের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ চালু হয়েছে। এর আগে বাংলাদেশি ব্যবসাগুলোকে বৈদেশিক মুদ্রা-সুবিধাযুক্ত কার্ড ব্যবহার করতে হতো। উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি বড় বাস্তব বাধা ছিল, বিশেষ করে ছোট ব্যবসা ও নতুন বিজ্ঞাপনদাতাদের ক্ষেত্রে। বিকাশের ৮ কোটি ২০ লাখের বেশি নিবন্ধিত গ্রাহক থাকায় স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থা বিজ্ঞাপন কেনার প্রবেশাধিকার বাড়াতে পারে। মেটা ও লাইটক্যাসলের ‘স্মল বিজনেস গ্রোথ একাডেমি’র আওতায় ইতিমধ্যে এক হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে ডিজিটাল বিপণন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবসায়িক সরঞ্জাম ব্যবহারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসার বিস্তারও মেটার সম্ভাব্য স্থানীয় উপস্থিতির অর্থ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ফেসবুকভিত্তিক সামাজিক বাণিজ্যকে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণাটিতে আরও দেখা যায়, ক্রেতাদের সিদ্ধান্তে পণ্যের মান, সেবা, মূল্য, পর্যালোচনা ও বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ ফেসবুক এখন কেবল প্রচারের জায়গা নয়; অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে এটি বিক্রির বাজারও।
এই জায়গায় ঢাকায় মেটার একটি স্থায়ী কার্যালয় হলে সম্ভাব্য পরিবর্তনের প্রথম দিকটি হতে পারে ব্যবসায়িক সহায়তা। স্থানীয় কর্মী ও প্রতিনিধিত্ব বাড়লে বিজ্ঞাপন, ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল বিপণন এবং প্ল্যাটফর্মসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশি ব্যবসার সঙ্গে মেটার যোগাযোগ সরাসরি হতে পারে। এর পাশাপাশি স্থানীয় অবকাঠামো বা এজ নোড স্থাপন হলে মেটার বিভিন্ন সেবার তথ্য দেশের ভেতর থেকে আরও দক্ষভাবে সরবরাহ করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসবই সম্ভাব্য ফল; অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে সবগুলো বাস্তবে হবে এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
আরেকটি বড় বিষয় হলো অনলাইন নিরাপত্তা ও জবাবদিহি। সেপ্টেম্বরে শামা ওবায়েদের সঙ্গে বৈঠকে অনলাইন হয়রানি ও ডিজিটাল নিপীড়ন ঠেকাতে মেটার সহযোগিতার কথা ওঠে। একই সময়ে বাংলাদেশ সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা আনার কথা জানিয়েছে। ফলে ঢাকায় মেটার কোনো কার্যালয় হলে সেটি শুধু ব্যবসা ও বিজ্ঞাপনের কেন্দ্র হবে, নাকি সরকারি সংস্থার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা রয়েছে ডিজিটাল অর্থনীতিতে। স্থানীয় পেমেন্ট, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ই-কমার্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল বিপণনের সুযোগ একসঙ্গে বাড়লে এর প্রভাব শুধু মেটার অফিসে চাকরি তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ছোট ব্যবসার বাজার সম্প্রসারণ, অনলাইন বিক্রি, বিজ্ঞাপন খাত, প্রযুক্তি-দক্ষতা এবং ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরিতেও পড়তে পারে। বাংলাদেশের ই-কমার্স খাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দপ্তরের বিশ্লেষণেও ফেসবুকভিত্তিক ব্যবসাকে ডিজিটাল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য ডিজিটাল বিপণনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
তাই এখন আসল খবর শুধু মেটা ঢাকায় অফিস খুলবে কি না, তা নয়। গত আগস্টে স্থানীয় অবকাঠামো নিয়ে আলোচনা, সেপ্টেম্বরে স্থানীয়ভাবে বিজ্ঞাপনের বিল দেওয়ার সুযোগ, এক হাজারের বেশি ব্যবসাকে প্রশিক্ষণ এবং সর্বশেষ ঢাকায় অফিসের জন্য সরকারি আমন্ত্রণ—ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশে মেটার স্থানীয় সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এখন সেই আগ্রহ বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, কর্মসংস্থান, ব্যবসায়িক সহায়তা ও জবাবদিহিতে রূপ নেয়, সেটিই ঠিক করবে ঢাকায় মেটার উপস্থিতি শেষ পর্যন্ত শুধু একটি অফিসের গল্প হবে, নাকি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা করবে।
নবোদয়/ আরআই/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬