Loading...

ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন এখন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার পাশাপাশি নাগরিকদের চলাচল ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি করেছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে পরিবহন ও যোগাযোগে বিধিনিষেধ আরোপের পর সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থামিয়ে দেওয়া যায় না।


ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলন এখন ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার পাশাপাশি নাগরিকদের চলাচল ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে নতুন বিরোধ তৈরি করেছে। বিক্ষোভ ঠেকাতে দিল্লিতে পরিবহন ও যোগাযোগে বিধিনিষেধ আরোপের পর সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা থামিয়ে দেওয়া যায় না।
শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ কর্মসূচিকে ঘিরে কেন্দ্রীয় এলাকায় ব্যারিকেড, তল্লাশি ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, পুলিশ সূত্রের হিসাবে প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। দিল্লির বাইরে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আন্দোলনের সমর্থক ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও রয়েছেন বলে পুলিশের মুখপাত্র জানিয়েছেন।
শুক্রবার (০৯ অক্টোবর ) প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ মেট্রো স্টেশন বন্ধ ও দিল্লিমুখী ট্রেন বাতিলের বিরুদ্ধে আবেদনের শুনানিতে বিধিনিষেধের মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আদালতের বক্তব্য, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হতে পারে না। ‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার’ করার উপমা দিয়ে বেঞ্চ সম্পূর্ণ পরিবহন বন্ধের বদলে নিয়ন্ত্রিত চলাচল নিশ্চিত করতে বলে।
আদালত শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও প্রবীণ যাত্রীদের দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তোলে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা কর্তৃপক্ষকে বিধিনিষেধ পুনর্বিবেচনার কথা জানাবেন বলে আশ্বাস দেন। তবে এই শুনানিতে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। আদালতের নির্দেশের বিষয় ছিল পরিবহন চলাচল ও জনদুর্ভোগ। ফলে সব নিরাপত্তা বিধিনিষেধ উঠে গেছে বলেও ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

মেট্রোর ক্ষেত্রেও পুরো নেটওয়ার্ক বন্ধের সঙ্গে স্টেশনের ফটক বন্ধের পার্থক্য রয়েছে। এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ৫৭টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। শুক্রবার রাতে সংশোধিত তালিকায় সংখ্যা কমিয়ে ৪৫ করা হয়। অধিকাংশ স্টেশনে লাইন পরিবর্তনের সুবিধা বহাল রাখার কথা জানানো হয়। দিল্লির দুই প্রধান রেলস্টেশনমুখী বহু ট্রেনও বাতিলের আওতায় এসেছে।
ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশও নির্দিষ্ট এলাকার জন্য। জনপথ–কর্তব্যপথের সংযোগস্থল থেকে চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধে শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে শনিবার রাত ১০টা পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট স্থগিত করা হয়েছে। হোটেল, হোস্টেল ও অতিথিশালায় তল্লাশির খবর পাওয়া গেছে।
ফলে আন্দোলনকারীদের জমায়েতের পাশাপাশি আশপাশের মানুষের যাতায়াত, অবস্থান ও যোগাযোগেও বিধিনিষেধের প্রভাব পড়ছে। এনডিটিভির তথ্যে, জুলাইয়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে সিজেপির কর্মসূচিতেও দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধে ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। এবার পরিধি বেড়েছে। অনলাইনে সংগঠিত আন্দোলনের খবর ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
সরকার অবশ্য পদক্ষেপগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বলছে। স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহনের চিঠিতে সমাবেশের অনুমতি প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে প্রক্রিয়াগত নিয়ম না মানা ও আগের কর্মসূচিতে দেওয়া অঙ্গীকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যগুলোকে দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে আগাম ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আয়োজকেরা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকারের কথা বলছেন।
আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে বিরোধ। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুনে বিহারে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ায় ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।
একই অনুসন্ধানে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর ১০ মাসে অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তির কথা উঠে আসে। নতুন ভোটার নিবন্ধন, নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল এবং ভোটার তথ্যভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। কমিশন বলেছে, ভিন্নমত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাভাবিক অংশ এবং গত বছরের সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মত ছিল। ফলে বিরোধীদের অনিয়মের অভিযোগ ও কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে বিরোধ রয়ে গেছে।

এটি এক দিনের বিক্ষোভ নয়। গত ২ অক্টোবর যন্তর মন্তর ও আশপাশ থেকে প্রায় ৭০০ জনকে আটক করা হয়েছিল বলে পুলিশের বরাত দিয়ে পিটিআই জানায়। তাদের মধ্যে ছাত্রসংগঠন ও আম আদমি পার্টির নেতারা ছিলেন। সিজেপির নেতা অভিজিৎ দীপকে গ্রেপ্তারের আশঙ্কা জানালেও সমর্থকদের উসকানি এড়িয়ে অহিংস আন্দোলন চালানোর আহ্বান দিয়েছেন।
সড়কের আন্দোলনের পাশাপাশি বিরোধী জোট ইন্ডিয়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও যাচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার কথা এসেছে। শুক্রবার রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ নেতারা দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করেন। তাদের দাবির মধ্যে সিইসির অপসারণ, এসআইআর স্থগিত ও বাদ পড়া ভোটারের নাম ফেরানো রয়েছে। খাড়গে জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ চেয়েছেন।
২০২৭ সালের শুরুতে উত্তরপ্রদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ভোট হওয়ার কথা। সেই ভোটের আগে তালিকা সংশোধনের গ্রহণযোগ্যতা ও কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধ রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপি অবশ্য ভোটে কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। দলটির দাবি, বিরোধীরা নির্বাচনে জিততে না পেরে এসব অভিযোগ তুলছে।
বিক্ষোভকারীরা নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহি চাইছেন, সরকার নিরাপত্তার যুক্তি দিচ্ছে, আর আদালত সামনে এনেছে নাগরিকের চলাচলের প্রশ্ন। শনিবারের কর্মসূচিতে মোট অংশগ্রহণকারী ও আটকের পূর্ণাঙ্গ সংখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে রাজধানীতে বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ দেখাচ্ছে, এই আন্দোলনের প্রভাব সমাবেশস্থলের বাইরেও পৌঁছেছে। নির্বাচনি আস্থা ফেরানোর বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিবাদ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমার প্রশ্ন।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ১০ অক্টোবর ২০২৬