Loading...

বিশ্ব প্রাণী দিবস
বনের মধ্যে রাস্তা বা রেললাইন তৈরি হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হয়। কিন্তু বন্যপ্রাণীর খাবার ও পানির উৎসের মাঝখানে সেই অবকাঠামো পড়লে তার পরিচিত পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। খামারে আবার পরিকল্পনাহীন সংকরায়ণে হারাতে পারে দেশীয় জাতের বৈশিষ্ট্য।


বনের মধ্যে রাস্তা বা রেললাইন তৈরি হলে মানুষের যাতায়াত সহজ হয়। কিন্তু বন্যপ্রাণীর খাবার ও পানির উৎসের মাঝখানে সেই অবকাঠামো পড়লে তার পরিচিত পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। খামারে আবার পরিকল্পনাহীন সংকরায়ণে হারাতে পারে দেশীয় জাতের বৈশিষ্ট্য। প্রাণীর আবাসস্থল ও জিনগত সম্পদ রক্ষার সঙ্গে তাই মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকাও জড়িত।
৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রাণীদের চোখ দিয়ে পৃথিবীকে দেখুন’। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই আহ্বানের অর্থ বনভূমি, প্রাণীর চলাচলের পথ, খামারের প্রজননব্যবস্থা এবং প্রাণীর প্রতি আচরণকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া। সংরক্ষণের আলোচনাকে মানুষের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনও সামনে আসছে।
বন্যপ্রাণী রক্ষায় করিডর খুবই প্রয়োজনীয় জিনিস। করিডর হলো বিচ্ছিন্ন আবাসস্থলের মধ্যে চলাচলের সংযোগ। এর মাধ্যমে প্রাণী খাবার, পানি ও প্রজননের উপযুক্ত এলাকা খুঁজে পায়। রাস্তা, রেললাইন বা বসতি এই সংযোগ কেটে দিলে প্রাণীর দলগুলো বিচ্ছিন্ন হতে পারে; লোকালয়ে ঢুকে সংঘাতের ঝুঁকিও বাড়ে। আইইউসিএনের নির্দেশনায় সুস্থ বাস্তুতন্ত্র ও জলবায়ু অভিযোজনের জন্য এই সংযোগ সংরক্ষণকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।
বাংলাদেশে হাতির ক্ষেত্রে সংকটটি স্পষ্ট। বন বিভাগের সহযোগিতায় আইইউসিএনের ২০১৩–২০১৬ সালের জরিপে ১২টি গুরুত্বপূর্ণ করিডর এবং ভারত–মিয়ানমার সীমান্তে ৫৭টি পারাপারের স্থান চিহ্নিত হয়েছিল। সেই জরিপে আবাসিক বন্য হাতির সংখ্যা আনুমানিক ২৬৮ এবং পরিযায়ী হাতির গড় সংখ্যা ৯৩ ধরা হয়। ওই মূল্যায়নে বাংলাদেশের হাতিকে জাতীয়ভাবে মহাবিপন্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াসিন নেওয়াজ গণমাধ্যমকে বলেছেন, হাতির ১২টি করিডরের মধ্যে কোনোটি দখল, কোনোটি অবকাঠামো নির্মাণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলাচলের পথে মাছের খামার, পানবরজ ও রেলপথ গড়ে উঠেছে। তার মতে, হাতি রক্ষায় প্রশাসন ও বন বিভাগের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

দোহাজারী–কক্সবাজার রেলপথ উন্নয়ন ও সংরক্ষণের সমন্বয়ের একটি পরীক্ষা। রেলপথটি চুনতি ও ফাঁসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং মেধাকচ্ছপিয়া জাতীয় উদ্যানের মধ্য দিয়ে গেছে। এডিবির তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে একটি হাতি পারাপারের ওভারপাস, দুটি বন্যপ্রাণী আন্ডারপাস এবং বড় কালভার্ট রাখা হয়েছে। এসব কাঠামোর উদ্দেশ্য রেললাইনের দুই পাশের চলাচল বজায় রাখা।
এসবের ব্যবহার নিয়ে সময়ভেদে ভিন্ন তথ্যও এসেছে। প্রকল্পের পরিবেশ পরামর্শক আসিফ ইমরান গণমাধ্যমকে জানান, জুনে ওভারপাস দিয়ে মাত্র দুবার হাতি চলেছে। আবার এডিবির ১৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে তার বক্তব্যেই প্রায় প্রতি সপ্তাহে হাতি পারাপারের উল্লেখ করা হয়েছে। কার্যকারিতা বোঝার জন্য সময়ভিত্তিক ক্যামেরার তথ্য, মানুষের অনুপ্রবেশ এবং পুরোনো পথের সংযোগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
করিডর সুরক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণও প্রয়োজন। প্রাণীর চলাচলের সময় ও পথ শনাক্তে তাদের তথ্য কাজে লাগে। ফসল, বসতি ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় সতর্কতাব্যবস্থা এবং দ্রুত সহায়তার ব্যবস্থা থাকলে সংরক্ষণের প্রতি আস্থা বাড়তে পারে। নতুন প্রকল্পের পরিবেশগত মূল্যায়নেও এই মানুষ–প্রাণী সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে হবে।
বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি দেশীয় প্রাণিসম্পদের জিনগত বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। রেড চিটাগাং গরু, পাবনা গরু ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল স্থানীয় প্রাণিসম্পদের পরিচিত অংশ। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট রেড চিটাগাং ও ব্ল্যাক বেঙ্গলের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এখানে মূল কাজ জাতের স্বাতন্ত্র্য, উপযোগী বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যৎ প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় বৈচিত্র্য ধরে রাখা।
বিএলআরআই ও সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২১ সালের পর্যালোচনায় রেড চিটাগাং গরুর স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং কিছু রোগ ও পরজীবীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতার গুরুত্ব উঠে এসেছে। গবেষকেরা নির্বিচার সংকরায়ণে জাতটির সংখ্যা ও স্বাতন্ত্র্য কমার উদ্বেগও তুলে ধরেছেন। খামারির অংশগ্রহণে প্রজননের নথি, জাতভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কর্মসূচি ভবিষ্যতের উৎপাদন পরিকল্পনায় কাজে আসতে পারে।
মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে ভূমিকা রাখে শকুন। আইইউসিএন জানিয়েছে, গবাদিপশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু বিষাক্ত ব্যথানাশক মৃতদেহের মাধ্যমে শকুনের ক্ষতি করছে। ফলে প্রাণিসম্পদের চিকিৎসায় ওষুধ নির্বাচনের সিদ্ধান্তও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে প্রভাব ফেলে। নিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতি ও বিষটোপ বন্ধ করা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাণিসম্পদের এই বৈচিত্র্য ছোট খামারিদের আয় ও খাদ্য সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত। জাত নির্বাচনে দুধ বা মাংসের পরিমাণের পাশাপাশি খাবার, চিকিৎসা ও স্থানীয় পরিবেশে টিকে থাকার ব্যয় বিবেচনা জরুরি। দেশীয় জাতের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ একসঙ্গে চললে কৃষকের জন্য ভবিষ্যতের বিকল্প প্রজননসম্পদও বজায় থাকে।
মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে দেখার ধারণা ‘ওয়ান হেলথ’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আবাসস্থল খণ্ডিত হওয়া, বন্য এলাকায় অনুপ্রবেশ, প্রাণী বাণিজ্য ও জলবায়ুর চাপ রোগের উদ্ভব ও বিস্তারের নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। জলাতঙ্ক ও বার্ড ফ্লুর মতো রোগ মোকাবিলায় প্রাণীর স্বাস্থ্য নজরদারি এবং মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বয় তাই প্রয়োজন।
খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারেও ঝুঁকি আছে। এর ফলে ওষুধপ্রতিরোধী জীবাণু তৈরি ও বিস্তার লাভ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যাখ্যায়, প্রতিরোধী জীবাণু মানুষ, প্রাণী, খাদ্য, মাটি ও পানির মাধ্যমে ছড়াতে পারে এবং সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন করে তোলে। পশুচিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নজরদারি, পরিচ্ছন্ন খামার এবং নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা এখানে একই সুরক্ষাব্যবস্থার অংশ।
আইনেও দায়িত্ব নির্ধারিত রয়েছে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ প্রতিরোধের বিধান দিয়েছে; আইনসিদ্ধ কারণ ছাড়া মালিকবিহীন প্রাণী নিধন বা অপসারণ নিষিদ্ধ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যাপক কুকুর টিকাদানকে কার্যকর কৌশল বলেছে। স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান, মানবিক জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীল প্রতিপালন একসঙ্গে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এ ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণীর তালিকা হালনাগাদ এবং আবাসস্থল ও করিডর চিহ্নিত করে সুরক্ষার বিধান রয়েছে। এর বাস্তব প্রয়োগে অবকাঠামোর নকশার আগে প্রাণীর চলাচল শনাক্ত, সংরক্ষিত এলাকার সংযোগ রক্ষা এবং নির্মাণের পর পর্যবেক্ষণ জরুরি। বন বিভাগ, প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ এবং দায়িত্বের জবাবদিহি সংরক্ষণকে কার্যকর করতে পারে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬