Loading...

সাইবার অপরাধ
হ্যাকার হতে এখন আর কম্পিউটারবিজ্ঞানের ডিগ্রি লাগে না। ফিশিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল কিংবা অনলাইন প্রতারণার নানা কৌশল শেখা যাচ্ছে সহজেই। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে দ্রুত টাকা আয়ের লোভ, বন্ধু বা স্থানীয় চক্রের প্রভাব, বেকারত্ব এবং মানুষের কম ডিজিটাল সচেতনতা।


হ্যাকার হতে এখন আর কম্পিউটারবিজ্ঞানের ডিগ্রি লাগে না। ফিশিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল কিংবা অনলাইন প্রতারণার নানা কৌশল শেখা যাচ্ছে সহজেই। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে দ্রুত টাকা আয়ের লোভ, বন্ধু বা স্থানীয় চক্রের প্রভাব, বেকারত্ব এবং মানুষের কম ডিজিটাল সচেতনতা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রেপ্তার হওয়া সাইবার অপরাধীদের ঘটনা ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এই কয়েকটি কারণই অনেক তরুণকে টেনে নিচ্ছে অনলাইন অপরাধের জগতে।
নাটোরের লালপুরের ওহিদুল মোল্লার ঘটনা সেই প্রবণতারই একটি উদাহরণ। এলাকায় ‘হ্যাকিং গুরু’ হিসেবে পরিচিত ওহিদুলকে ২২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানায়, তার কাছ থেকে ৬৮টি সিম পাওয়া গেছে এবং তার বাড়ির পথে বসানো ছিল অন্তত ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা।
অভিযোগ রয়েছে, তার চক্র প্রবাসীদের ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার ও ইমো অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিত। কিন্তু ওহিদুলের গল্পের আসল প্রশ্ন ২০টি ক্যামেরা বা ৬৮টি সিম নয়; প্রশ্ন হলো, কেন এ ধরনের অপরাধে ক্রমেই নতুন মানুষ যুক্ত হচ্ছে এবং কী তাদের এই পথে টানছে।
প্রযুক্তিবিদ না হয়েও অপরাধে
গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো বলছে, সাইবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের সবাই উচ্চতর প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন নন। ২০২২ সালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের একজন কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তাদের হাতে ইমো, ফেসবুক ও মোবাইল আর্থিক সেবা হ্যাকিংয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই নন-টেকনিক্যাল পটভূমি থেকে আসা। তাদের প্রায় ৯০ শতাংশের বয়স ছিল ২৮ বছরের নিচে।
তার মতে, সহজে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট পাওয়া, অনলাইনে প্রতারণার কৌশল শেখার সুযোগ এবং ব্যবহারকারীদের কম ডিজিটাল সচেতনতার সুযোগ নিচ্ছেন অপরাধীরা। তবে এই তথ্য সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সেই সময়ের গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের নিয়ে; এটিকে দেশের সব সাইবার অপরাধীর চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না।
বন্ধু, বেকারত্ব ও দ্রুত টাকার আকর্ষণ
বাংলাদেশের ১৬৭ কিশোরকে নিয়ে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানমূলক গবেষণায় সাইবার অপরাধে জড়ানোর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দুর্বল আইন প্রয়োগ, পারিবারিক ও সামাজিকীকরণের সমস্যা, বন্ধুদের প্রভাব, সহজ ইন্টারনেটপ্রাপ্তি এবং বেকারত্ব উঠে আসে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া কিশোরদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ বন্ধু বা সমবয়সীদের প্রভাব এবং ৫৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেকারত্বকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে। তবে গবেষণাটি নন-প্রবাবিলিটি নমুনার ওপর করা হয়েছিল। ফলে এই হারকে জাতীয় চিত্র বলা যায় না।
সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারগুলো আরেকটি কারণকে আরও দৃশ্যমান করেছে: দ্রুত অর্থ উপার্জনের সুযোগ। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট দখল করে টাকা চাইছেন, কেউ ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করছেন, কেউ প্রবাসী পরিবারের আর্থিক লেনদেনকে নিশানা করছেন, আবার কেউ নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। অর্থাৎ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ বা কৌতূহল কারও ক্ষেত্রে শুরুটা করে দিতে পারে, কিন্তু অপরাধকে লাভজনক পেশায় পরিণত করছে অর্থ।
প্রবাসী থেকে নারী, টার্গেটের পরিধি বাড়ছে
২০২৪ সালে দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট। পুলিশের দাবি, তারা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতারণা করতেন। তাদের কাছ থেকে প্রায় ৫০০ ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়ার কথাও জানানো হয়।
একই বছর এক বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। অভিযোগ, অর্ধশতাধিক নারীর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে তিনি ব্ল্যাকমেইল করতেন।
২০২৬ সালেও কয়েকটি ঘটনায় হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরিচিত ব্যক্তির পরিচয়ে টাকা চাওয়া এবং ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ সামনে আসে।
বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের একটি জরিপেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংকে জরিপে পাওয়া সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় শ্রেণি হিসেবে দেখানো হয়। হার ছিল ২১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
জরিপে অংশ নেওয়া ভুক্তভোগীদের ৭৮ দশমিক ৭৮ শতাংশের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৩০ বছর এবং ৫৯ শতাংশ ছিলেন নারী। তবে মাত্র ১৩২ জন ভুক্তভোগীর তথ্যের ওপর জরিপটি করা হয়েছিল। ফলে এটিকেও সারা দেশের অপরাধের হার হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
ব্যক্তিগত তথ্য থেকে সরকারি ব্যবস্থা
সাইবার অপরাধ এখন শুধু ফেসবুক-ইমো বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালে নাগরিকদের এনআইডি, ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা ও এসএমএস-সংক্রান্ত তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ ও বিক্রির অভিযোগে একটি চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।
এর আগে ২০২৩ সালে র্যাব (বর্তমানে এসআরবি) একটি চক্রকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বিরুদ্ধে বিআরটিএ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে ঢুকে ভুয়া মানি রিসিট তৈরি করে প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ছিল। একই চক্রের বিরুদ্ধে ডেসকোর ডিজিটাল ব্যবস্থায় ঢুকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে।
চলতি সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের খুলশীতে একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ জব্দ করা হয়। তদন্ত চলায় তাদের সবাইকে ‘হ্যাকার’ বলা যাচ্ছে না। তবে ঘটনাটি দেখাচ্ছে, অনলাইন প্রতারণা স্থানীয় ছোট চক্রের গণ্ডি ছাড়িয়ে সংগঠিত ও আন্তদেশীয় রূপও নিতে পারে।
দুর্বল নিরাপত্তা অপরাধীদের সুযোগ বাড়ায়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক বিএম মাইনুল হোসেনের মতে, সাইবার অপরাধীরা এমন ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল ব্যবস্থা খুঁজে বেড়ায়, যেখানে নিরাপত্তার দুর্বলতা রয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার তৃতীয় পক্ষ তৈরি করলে নিরাপত্তা যথাযথভাবে নিশ্চিত হচ্ছে কি না, সেটিও কঠোরভাবে যাচাই করা দরকার। দেশে দক্ষ সাইবার নিরাপত্তা জনবলের ঘাটতিকেও বড় সমস্যা হিসেবে দেখেন তিনি।
সাইবার অপরাধ ও ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহাও বলেছেন, শুধু ডেটা ব্রিচের সংখ্যা নয়, অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে অনুপ্রবেশ শনাক্ত করতে না পারাও উদ্বেগের। তার মতে, ধারাবাহিক নজরদারি, প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং হামলার পর দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
নবোদয়/ কেএ/ জেডআরসি/ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬