Loading...

ঢাকায় মনোরেল
প্রচলিত রেল বা মেট্রোর ট্রেন সাধারণত দুটি রেলের ওপর চলে। মনোরেল চলে একটি বিশেষ বিম বা একক পথের ওপর ভর করে। অধিকাংশ শহুরে মনোরেল উড়ালপথে নির্মিত হয়। তুলনামূলক কম জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ করা যায় বলে ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সড়কের শহরে এটি ব্যবহারের নজির রয়েছে।


ঢাকার মেট্রোরেলের পর এবার আলোচনায় মনোরেল। মেট্রোরেলের যাত্রীদের শেষ গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর সংযোগকারী পরিবহন হিসেবে মনোরেল চালুর পরিকল্পনায় প্রথম বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষার চুক্তি হওয়ার কথা। ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ কোটি টাকা। তবে মনোরেল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। সমীক্ষাতেই নির্ধারিত হবে ঢাকার জন্য এটি কারিগরি ও অর্থনৈতিকভাবে কতটা বাস্তবসম্মত।
মনোরেল কী, কী লাগে
প্রচলিত রেল বা মেট্রোর ট্রেন সাধারণত দুটি রেলের ওপর চলে। মনোরেল চলে একটি বিশেষ বিম বা একক পথের ওপর ভর করে। অধিকাংশ শহুরে মনোরেল উড়ালপথে নির্মিত হয়। তুলনামূলক কম জায়গায় অবকাঠামো নির্মাণ করা যায় বলে ঘনবসতিপূর্ণ ও সীমিত সড়কের শহরে এটি ব্যবহারের নজির রয়েছে।
তবে মনোরেলের জন্য একক রেলপথ ও শক্ত ভিত্তি, স্টেশন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, সংকেত ও ট্রেন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ডিপো, বিশেষায়িত ট্রেন, কারিগরি কর্মশালা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে যাত্রী সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। মেট্রোরেল, বাস ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে সহজে যাত্রী পরিবর্তনের ব্যবস্থাও থাকতে হয়।
বিশ্বব্যাংকের নগর রেল উন্নয়নবিষয়ক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, শুরুতেই স্টেশনের সক্ষমতা, ডিপোর পর্যাপ্ত জমি এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ না রাখলে পরে রেলব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে।

বাংলাদেশের সক্ষমতা কতটা
বাংলাদেশ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না। ঢাকায় এমআরটি লাইন-৬ পরিচালিত হচ্ছে এবং আরও কয়েকটি মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ফলে উড়াল রেল অবকাঠামো, স্টেশন ও ডিপো পরিচালনা, বৈদ্যুতিক ট্রেন, সংকেতব্যবস্থা এবং যাত্রী ব্যবস্থাপনায় প্রাথমিক প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।
কিন্তু মেট্রোরেল পরিচালনা আর মনোরেলের পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এক নয়। মনোরেলের একক রেলপথ, ট্রেন, লাইন পরিবর্তনের প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থা বিশেষায়িত। এটি চালু হলে প্রযুক্তি সংগ্রহের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, যন্ত্রাংশের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ এবং নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকার মেট্রোরেলের অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে দুই দফায় বিয়ারিং প্যাড পড়ে যাওয়ার পর যাত্রী পরিবহন শুরুর আগে পুরো ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ তৃতীয় পক্ষের নিরাপত্তা নিরীক্ষা না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারা এবং সেটি কয়েক দশক নিরাপদ ও সাশ্রয়ীভাবে পরিচালনা করা একই সক্ষমতা নয়।
তাহলে মনোরেল কেন
ডিটিসিএর প্রাথমিক পরিকল্পনায় প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটারের পাঁচটি পথ রয়েছে। এগুলো হলো পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা, মধ্য বাড্ডা-ভুলতা, রামপুরা-ডেমরা, মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা এবং উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার। বুয়েটের পরামর্শে এখন মোট ১৪টি সম্ভাব্য পথ যাচাই করা হবে। তিন মাসের মধ্যে একটি অগ্রাধিকার পথ বাছাই এবং ছয় মাসে সমীক্ষা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. শামসুল হকের মতে, ঢাকার সব এলাকায় মেট্রোরেল নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বাসাবো, গোড়ান, মাদারটেক কিংবা পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তুলনামূলক হালকা রেলব্যবস্থা ব্যবহার করে যাত্রীদের প্রধান মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা যেতে পারে।
তার মতে, বাস, দ্রুতগতির বিশেষ বাস, হালকা রেল বা মনোরেল এবং মেট্রোরেলের সমন্বয়ে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
যানজটে কতটা ভূমিকা রাখবে
মনোরেলের প্রয়োজনীয়তা বোঝার বড় প্রেক্ষাপট ঢাকার যানজট। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি প্রকল্প নথিতে ব্যবহৃত হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার যানজটে প্রতিদিন আনুমানিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। সংস্থাটি অপর্যাপ্ত ও খণ্ডিত গণপরিবহনব্যবস্থাকেও ঢাকার চলাচল সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ডিটিসিএর হিসাবে, ঢাকায় দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে মোটরসাইকেল, তিন চাকার যান ও ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বেড়েছে। ফলে শুধু নতুন সড়ক বা মেট্রোরেল নয়, মানুষকে ব্যক্তিগত ও ছোট যান থেকে কার্যকর গণপরিবহনে নিয়ে আসাও জরুরি।
মনোরেল সেখানে ভূমিকা রাখতে পারে, যদি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক যাত্রীকে মেট্রোরেল স্টেশনে পৌঁছে দিতে পারে। তবে শুধু মনোরেল চালু হলেই যানজট কমবে, এমন প্রমাণ এখনো নেই। মেট্রোরেলের সঙ্গে সহজ যাত্রী পরিবর্তন, সমন্বিত ভাড়া ও টিকিট, হাঁটার উপযোগী স্টেশন এলাকা এবং বাসের সংযোগ না থাকলে নতুন রেলপথ হলেও সড়কের গাড়ি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা অনিশ্চিত।

বড় পরীক্ষা ব্যয়, যাত্রী ও বিকল্প
মনোরেল পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: যে পথে মনোরেল হবে, সেখানে উন্নত বাসব্যবস্থার পরিবর্তে কেন মনোরেল প্রয়োজন? প্রস্তাবিত পথে কত যাত্রী চলাচল করবেন,তাদের কতজন ব্যক্তিগত গাড়ি বা মোটরসাইকেল ছেড়ে মনোরেলে আসবেন, প্রতি কিলোমিটার নির্মাণব্যয় কত, ভাড়া ও পরিচালন ব্যয় কত হবে, কত ভর্তুকি লাগবে এবং ডিপোর জমি কোথায় পাওয়া যাবে, এসব এখনো অজানা।
একই পথে বৈদ্যুতিক বাস, দ্রুতগতির বিশেষ বাস বা রেল চালালে ব্যয় ও সুবিধা কী হবে, সেই তুলনাও প্রয়োজন।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অন্তত একটি মনোরেল পথ চালু করা। তবে কোন পথ বাস্তবায়নযোগ্য, মোট ব্যয় বা সম্ভাব্য যাত্রী কত, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে ২০২৯ সাল আপাতত লক্ষ্য, নিশ্চিত উদ্বোধনের সময় নয়।
বাংলাদেশের মেট্রোরেল অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বড় নগর রেল অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনার একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটি মনোরেলের বিশেষায়িত প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করে না। একইভাবে উড়ালপথে মনোরেল চলবে বলেই ঢাকার যানজট কমবে, এমন সরল সমীকরণও নেই।
মনোরেলের যৌক্তিকতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এটি কত মানুষকে সড়কনির্ভর যাতায়াত থেকে গণপরিবহনে আনতে পারে এবং সেই কাজটি অন্য কোনো ব্যবস্থা আরও কম খরচে করতে পারে কি না, তার ওপর।
তাই সাড়ে ৭ কোটি টাকার সমীক্ষার সামনে প্রশ্ন শুধু ‘ঢাকায় মনোরেল নির্মাণ সম্ভব কি না’ নয়। আসল প্রশ্ন, ঢাকার পরিবহন সমস্যার জন্য মনোরেলই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কি না। সেই উত্তর তথ্য-উপাত্তে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত মনোরেলকে ঢাকার যানজটের সমাধান হিসেবে দেখা সময়ের আগেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
নবোদয়/ কেএ/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬