Loading...

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস
মানসিক অসুস্থতাকে চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হিসেবে মানতে অনীহা, সামাজিক লজ্জা, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা ও সেবার সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থাকছেন। হাসপাতালে জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থাও দুর্বল।


মানসিক অসুস্থতাকে চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা হিসেবে মানতে অনীহা, সামাজিক লজ্জা, বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা ও সেবার সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বাইরে থাকছেন। হাসপাতালে জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও মানসিক স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যবস্থাও দুর্বল। সচেতনতার অভাবের সঙ্গে যুক্ত এই প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি রোগী ও পরিবারের দুর্ভোগ দীর্ঘায়িত করছে। ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস।
দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও অবহেলা ও অসচেতনতার কারণে সামগ্রিক চিত্র এখনও অজানাই থেকে যাচ্ছে। দেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রথম জরিপ হয়েছিল ২০০৩-২০০৫ সালে। ওই জরিপে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার প্রায় ১৬ শতাংশ। এর ১৫ বছর পর দ্বিতীয় জরিপ হয়, সেখানে বলা হয়, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশুদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে নির্ণয়যোগ্য মানসিক রোগ আছে। এরপর আর কোনো সমীক্ষা করা হয়নি।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ ২০১৮–১৯-এর চূড়ান্ত ফল অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ১২ দশমিক ৬ শতাংশের নির্ণয়যোগ্য মানসিক রোগ ছিল। আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশুদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ চিকিৎসা নেননি।
গত ১৩ জুলাই সংসদে দেওয়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী রয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ১৭ জন। সরকারি খাতে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রায় ৩৫০ জন। ফলে শুধু রোগ শনাক্ত নয়, নিয়মিত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পরবর্তী সহায়তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টের সদস্যসচিব অধ্যাপক মো. নিজাম উদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, শরীরের অসুখকে গুরুত্ব দিলেও মনের অসুখকে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। মানসিক রোগ মানেই ‘পাগল’ হয়ে যাওয়া—এমন ধারণা মানুষকে চিকিৎসা থেকে দূরে রাখে। তার মতে, মনোরোগ চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, প্রশিক্ষিত নার্স ও সমাজকর্মীর সমন্বিত দলও প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। সেবা প্রধানত ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক থাকায় দূরের রোগীদের বাধা আরও বেশি।
পাবনা মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক সামিনা আক্তার জানান, অনেক পরিবার শুরুতে রোগীকে ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজি চিকিৎসায় নিয়ে যায়। অবস্থার উন্নতি না হলে পরে চিকিৎসকের কাছে আসে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের ভাষ্যে, পরিবারের কেউ কেউ ভুল ঠিকানা দিয়ে রোগীকে ফেলে যান এবং বছরের পর বছর খোঁজ নেন না। এসব অভিজ্ঞতা দেখায়, অবহেলা চিকিৎসাকেন্দ্রের দরজায় শেষ হয় না।
সরকারের প্রধান দুই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং পাবনা মানসিক হাসপাতাল। তবে পাবনার ৫০০ শয্যার হাসপাতালটি পুরোনো জনবল কাঠামোয় চলছে। অনুমোদিত ৩১ চিকিৎসকের মধ্যে নয়টি পদ শূন্য। তিনটি ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট পদেও কেউ নেই। শয্যাসংকটে রোগী ফেরত দিতে হয় বলে জানিয়েছেন পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ।
ইইজি ও ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপির যন্ত্র অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হওয়ার তথ্যও রয়েছে। রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। তাঁত, বেত, কাঠের কাজ ও দর্জির প্রশিক্ষণভিত্তিক পুনর্বাসন কার্যক্রম বন্ধ। নিরাপত্তার ফাঁক দিয়ে ঢুকে রোগীদের উসকানি দিয়ে ভিডিও তৈরির অভিযোগও উঠেছে। এতে চিকিৎসার পরিবেশের পাশাপাশি রোগীর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষায় ব্যবস্থাপনার ঘাটতি সামনে এসেছে।
পাবনায় প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে একাধিক প্রতিবেদনে। তবে সব চিকিৎসাকেন্দ্রে ওষুধের বর্তমান মজুত, সরঞ্জামের কার্যকারিতা ও প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহের সমন্বিত তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে নেই। তাই দেশজুড়ে চিকিৎসাসামগ্রী পর্যাপ্ত কি না, নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। ডব্লিউএইচওর ২০২৫ সালের বিনিয়োগবিষয়ক প্রতিবেদনে সেবা ও ওষুধপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরা হয়েছে। একই প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০২১ সালে মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্যে ব্যয় হয়েছিল।
অবহেলার আরেকটি ক্ষেত্র কর্মস্থল। সাংবাদিক, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যদের কাজের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক জীবনের ভারসাম্য হারানোর অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে। পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, পেশাগত মানসিক চাপ মোকাবিলায় আলাদা কাউন্সেলর নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কথা বলে সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তবে এই সহায়তা কর্মকর্তা ও কর্মস্থলভেদে ভিন্ন হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট রাউফুন নাহার বলেন, সাংবাদিক, চিকিৎসক, পুলিশ ও অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের মতো সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করা পেশাজীবীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা জরুরি। কর্মীদের কাছে সারাক্ষণ কাজের জন্য প্রস্তুত থাকার প্রত্যাশা দীর্ঘদিন মানসম্মত সেবার পথে বাধা। তার পরামর্শ, প্রতিষ্ঠানগুলো কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ, চাপ মোকাবিলার কর্মশালা এবং কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সুস্থ সীমারেখা নিশ্চিত করুক।
অবহেলার অর্থনৈতিক মূল্যও বড়। ডব্লিউএইচওর বিনিয়োগবিষয়ক প্রতিবেদনে ২০২১ সালে বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যাজনিত অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ২১ হাজার ৫০ কোটি টাকা হিসাব করা হয়েছে। অসুস্থতায় কাজে অনুপস্থিতি, কর্মস্থলে থেকেও পুরো সক্ষমতায় কাজ করতে না পারা ও অকালমৃত্যু এই ক্ষতির প্রধান কারণ। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ রোগীর সুস্থতার পাশাপাশি দেশের উৎপাদনশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দায়ও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকোর আদালত গত ৬ আগস্ট মেটাকে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার তহবিলে ৫৬৭ মিলিয়ন ডলার দিতে নির্দেশ দিয়েছে। অঙ্গরাজ্যের বিচার বিভাগের বিবৃতিতেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মেটা আপিলের ঘোষণা দিয়েছে। মামলাটি শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহির প্রশ্ন তুলেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ জেলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের প্রশিক্ষণ এবং দুর্গম এলাকায় টেলিমেডিসিন সম্প্রসারণ চলছে। পাবনা হাসপাতালকে এক হাজার শয্যার ইনস্টিটিউটে রূপান্তরে ১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য নেই।
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, ২০২৫ সালে সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে ৮৪৬ জন অ-বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবাদাতা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন এবং ২০ হাজারের বেশি পরামর্শসেবা দেওয়া হয়েছে। ২০২৬–৩০ মেয়াদের জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনাও তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। এসব অগ্রগতি থাকলেও কতজন পৃথক রোগী চিকিৎসা পেয়েছেন এবং তাদের অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে, তা পরামর্শসেবার সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে তাই নিয়মিত জরিপ, জনবল, কার্যকর সরঞ্জাম, পুনর্বাসন ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলের প্রয়োজনই সামনে এসেছে। এই সংকট বিচ্ছিন্ন নয়; দীর্ঘদিনের সেবাঘাটতি ও সামাজিক অবহেলার ধারাবাহিকতা।
নবোদয়/ এসএন/১০ অক্টোবর ২০২৬