Loading...

ভারতের নির্বাচন কমিশনে অনাস্থা
ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ কয়েক মাস ধরেই চলছে। গত কয়েক দিনে বিতর্কটি নতুন মাত্রা পেয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসায়। বিরোধীদের দাবি, সংশোধনের সুযোগে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে তালিকা থেকে কারা বাদ পড়ছেন এবং কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ কয়েক মাস ধরেই চলছে। গত কয়েক দিনে বিতর্কটি নতুন মাত্রা পেয়েছে নির্বাচন কমিশনের ভেতরের মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসায়। বিরোধীদের দাবি, সংশোধনের সুযোগে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে তালিকা থেকে কারা বাদ পড়ছেন এবং কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি, সংক্ষেপে এসআইআর, শুরু হয় ২০২৫ সালে বিহারে। মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিক জায়গায় নিবন্ধিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের নাম শনাক্ত করে তালিকা হালনাগাদ করাই এর ঘোষিত উদ্দেশ্য। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হিসাবে, ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া তালিকা থেকে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে।
সংশোধন প্রক্রিয়ায় পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য মেলানো এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়ার নিয়ম নিয়ে আপত্তি রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, পুরোনো নথি না থাকা কিংবা নামের বানানে অমিলের কারণে দরিদ্র, অভিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বৈধ ভোটাররা বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। তালিকা নির্ভুল রাখার প্রয়োজনের পাশাপাশি তাদের নাম বাদ গেলে দ্রুত সংশোধনের সুযোগ কতটা কার্যকর, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছে কমিশনের তিন সদস্যের মধ্যে দুজনের লিখিত আপত্তি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশি গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফরমে পরিবর্তন, বাদ পড়া নাম পুনর্বহাল এবং ভোটার তালিকার সফটওয়্যারে স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার। কিছু সিদ্ধান্ত তাদের অজান্তে নেওয়া হয়েছে বলেও তারা নথিতে উল্লেখ করেছেন।
কমিশন অবশ্য বলছে, সিদ্ধান্তের আগে সদস্যদের ভিন্নমত ও লিখিত পরামর্শ স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; এসআইআরসহ আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তগুলো সর্বসম্মতভাবে হয়েছে। ভোটার তথ্যের নিরাপত্তা এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের আইনি ক্ষমতা বজায় থাকার দাবিও করেছে কমিশন। ফলে প্রকাশিত আপত্তি ও কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে যে ফারাক রয়েছে, তা নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি ও বাস্তব প্রয়োগ যাচাই জরুরি।
পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে। নির্বাচন কমিশনের আদালতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘তথ্যগত অসংগতি’ শনাক্ত হওয়া প্রায় ৬০ লাখ ভোটারের বিষয় বিচারিক কর্মকর্তারা পরীক্ষা করেন। তাদের সিদ্ধান্তে ২৭ লাখ ১৬ হাজার নাম বাদ পড়ে; এর মধ্যে ২২ লাখ ২১ হাজার ভোটার নাম ফেরানোর আবেদন করেছেন। সংখ্যাটি রাজ্যে এসআইআরে বাদ পড়া সব নামের হিসাব নয়। ভোটের আগে আপিলে মাত্র ১ হাজার ৬০৭ জনের নাম ফেরত এসেছিল বলে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
এ বছর পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ২০৭টি আসন জিতেছে। রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআরের আগের তালিকা ব্যবহার করে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তুলেছেন।

বিশ্লেষকদের উদ্বেগ মূলত ভোটারের ওপর যাচাইয়ের চাপ এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা নিয়ে। কার্নেগি এনডাওমেন্টের গবেষক মিলান বৈষ্ণবের মতে, ভারতে রাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে নাগরিককে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দায়িত্ব নিয়েছে। বর্তমান পদ্ধতিতে তালিকায় থাকার যোগ্যতা প্রমাণের চাপ ভোটারের দিকে সরে যাচ্ছে। সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কুরেশি প্রশ্ন তুলেছেন, তিন সদস্যের কমিশনের নামে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তিনজনের মতামত যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছিল কি না।
চাপের মুখে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) কমিশন কয়েকটি পরিবর্তন জানিয়েছে। এখন নোটিশ পাওয়া ভোটারদের নথি সংগ্রহে কর্মকর্তারা তাদের বাড়িতে যাবেন; দরিদ্র ও আশ্রয়হীনদের জন্য সহায়তাকেন্দ্র হবে। ভোটার তালিকার সফটওয়্যার আইনের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না, তা দেখতে স্বাধীন বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটিও গঠন করা হবে। কমিশনের বৈঠকের আলোচ্যসূচি আগে পাঠানো এবং পরে কার্যবিবরণী প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এই পদক্ষেপগুলোর ফল নির্ভর করবে কত দ্রুত বাদ পড়া যোগ্য ভোটারের নাম ফেরে এবং আপিল নিষ্পত্তি হয় তার ওপর। ভারতের গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগের মীমাংসাও সেখানেই। অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, ভুলের কার্যকর প্রতিকার এবং কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃশ্যমান স্বচ্ছতা।
নবোদয়/ এসএন/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬