Loading...

ওএসডি ৮৫৬১ চিকিৎসক: সংকটে সরকারি হাসপাতাল
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট, অনেক রোগীর জায়গা হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়। অথচ বেতন পাওয়া ৮৪৫ চিকিৎসককে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছাড়া রেখে দেওয়ার তথ্য এসেছে গণমাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কেনার পরিকল্পনা করছে সরকার।


সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকসংকট, অনেক রোগীর জায়গা হচ্ছে মেঝে ও বারান্দায়। অথচ বেতন পাওয়া ৮৪৫ চিকিৎসককে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ছাড়া রেখে দেওয়ার তথ্য এসেছে গণমাধ্যমে। এই পরিস্থিতিতে সরকারি অর্থে বেসরকারি হাসপাতালের সেবা কেনার পরিকল্পনা করছে সরকার। জরুরি চাপ সামলানোর এই পথ রোগীদের সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে; কিন্তু নিজস্ব জনবল ও অবকাঠামো কাজে লাগানোর ঘাটতি রেখে নতুন ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওএসডি চিকিৎসক ৮ হাজার ৫৬১ জন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৭১৬ জন উচ্চশিক্ষা অথবা হাসপাতালে সংযুক্তির কাজে রয়েছেন। বাকি ৮৪৫ জন প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক কারণে ওএসডি। মূল প্রশ্ন, দায়িত্বহীন অংশকে যোগ্যতা ও হাসপাতালের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানো যাচ্ছে না কেন।
পদ বিলুপ্তি, পদায়নের জটিলতা ও রাজনৈতিক বিবেচনার কথা এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনিয়মের কারণে কিছু চিকিৎসক ওএসডি থাকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাদের কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও বলেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
সংকটের সরকারি স্বীকৃতিও রয়েছে। ১০ জুন সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, চিকিৎসকের অনুমোদিত ৪১ হাজার ৮০৬ পদের মধ্যে ৯ হাজার ৪০৭টি শূন্য। নার্সের ৫ হাজার ৩২টি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ৮ হাজার ৭৮৪টি পদও খালি। চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক জনবলের সমন্বিত ঘাটতির ব্যাপ্তি এতে স্পষ্ট।
ঢাকামুখী রোগীর চাপের পেছনে স্থানীয় সেবার দুর্বলতাও রয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিশোরগঞ্জের নিকলী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ১৭ পদের বিপরীতে ছয়জন কর্মরত থাকার তথ্য এসেছে। মেডিসিন, সার্জারি ও গাইনির বিশেষজ্ঞ নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তা। উপজেলায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না মিললে রোগীকে জেলা বা রাজধানীতে ছুটতে হয়; সঙ্গে বাড়ে যাতায়াত, থাকা ও কাজ হারানোর খরচ।

শুধু জনবল নয়, কেনা সম্পদ ব্যবহারের ব্যর্থতাও ধরা পড়েছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের অর্থায়নে পিপিআরসির গবেষণা নিয়ে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আট বিভাগের ২২ সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে রোগনির্ণয় যন্ত্রের ৫২ শতাংশ আগের এক বছরে ব্যবহৃত হয়নি। ওষুধের মজুতেও ঘাটতি ছিল।
একই গবেষণায় জরিপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট বাজেটের ৮৫ শতাংশ খরচ করেছে। সাধারণ সরঞ্জাম কেনার বরাদ্দ ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ সমস্যা কেবল কম বরাদ্দ নয়; ক্রয়প্রক্রিয়া, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ কর্মী ও প্রশাসনিক সমন্বয়েরও। পিপিআরসির হোসেন জিল্লুর রহমান বরাদ্দকে কার্যকর সেবায় রূপান্তরের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
অব্যবস্থাপনার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত পরিবারে পড়ে। বিশ্বব্যাংকে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট চলতি স্বাস্থ্যব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩১ শতাংশ এসেছে মানুষের সরাসরি নিজস্ব পকেট থেকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা বা ওষুধ না মিললে বাইরের খরচ এড়ানো কঠিন। তাই হাসপাতাল বদলানোর উদ্যোগের মূল্যায়নে রোগীর প্রকৃত ব্যয় কমছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা মেডিকেলের চাপ কমাতে এম এইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ইমপালস হাসপাতাল, শাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সেবা কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী পাঠানো হবে, মাস শেষে বিল দেবে সরকার। তবে কোন রোগের চিকিৎসা হবে এবং সরকার ও রোগী কতটা খরচ বহন করবেন, তা চূড়ান্ত হয়নি।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেনের যুক্তি, নতুন হাসপাতাল নির্মাণে কয়েক বছর লাগে; বিদ্যমান বেসরকারি শয্যা ব্যবহার করলে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে রোগী কম থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষাও ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি রোগী সেখানে গেলে সেবা ও শিক্ষা—দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা হবে বলে মনে করছে সরকার।

তবে নতুন হাসপাতাল নির্মাণের এককালীন ব্যয়ের সঙ্গে বেসরকারি সেবার দৈনিক ভর্তুকি তুলনা করেই সাশ্রয় প্রমাণ হয় না। কয়েক বছরের মোট বিল, পরীক্ষা ও ওষুধের দাম, পরিবহন, প্রশাসনিক খরচ এবং সরকারি হাসপাতালের একই সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যয়ও তুলনায় প্রয়োজন। চুক্তির মূল্য ও রোগীর বাড়তি খরচ নির্ধারিত না হওয়ায় পরিকল্পনাটি সত্যিই সাশ্রয়ী কি না, এখনই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুস সবুর খান নির্দিষ্ট হাসপাতাল বেছে নেওয়ার পরিবর্তে উন্মুক্ত দরপত্রের পরামর্শ দিয়েছেন। তার উদ্বেগ, শক্ত তদারকি ছাড়া চিকিৎসা দেওয়া রোগীর চেয়ে বেশি বিল দেখানোর সুযোগ থাকবে। অন্যদিকে জনস্বাস্থ্যবিদ বেনজির আহমেদ উপজেলা পর্যায়ের সেবা বাড়ানোর কথা বলেছেন। ঢাকার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে রোগী সরালেই প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাবঞ্চনা দূর হবে না।
সরকার রোগী পাঠানোর প্রক্রিয়া সফটওয়্যারে নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। কিন্তু ডিজিটাল নিবন্ধনের পাশাপাশি বাস্তবে কী চিকিৎসা হলো, কোন পরীক্ষার প্রয়োজন ছিল এবং রোগীর কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলো কি না—এসবের স্বাধীন যাচাই দরকার। প্রকাশ্য সেবামূল্য, রোগীর সম্মতি ও নিরাপত্তা, চিকিৎসার মানদণ্ড, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বিল নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া সরকারি অর্থে সেবা কেনার জবাবদিহি অসম্পূর্ণ থাকবে।
বেসরকারি সক্ষমতা ব্যবহারে সুফল নির্ভর করবে খরচ, মান ও নিয়ন্ত্রণের ওপর। পাশাপাশি চিকিৎসকের প্রয়োজনমাফিক পদায়ন, যন্ত্র সচল রাখা, ওষুধের সরবরাহ ও স্থানীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসবের অগ্রগতি প্রকাশ না হলে রোগী হাসপাতাল বদলালেও রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থাপনা বদলাচ্ছে কি না, তা বোঝা যাবে না।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬