Loading...

প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত
বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সহায়তায় বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছে জাতিসংঘ। এই অর্থসংকট বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের। কারণ কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার খাদ্য, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও সুরক্ষার বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।


বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সহায়তায় বড় ধরনের অর্থসংকটে পড়েছে জাতিসংঘ। এই সংকট বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের। কারণ কক্সবাজার ও ভাসানচরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার খাদ্য, স্বাস্থ্য, আশ্রয়, শিক্ষা ও সুরক্ষার বড় অংশ এখনো আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ফলে দাতাদের অর্থায়ন আরও কমতে থাকলে শুধু রোহিঙ্গাদের সহায়তাই সংকুচিত হবে না, এর আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপের একটি অংশ বাংলাদেশের ওপরও এসে পড়তে পারে। কারণ জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সতর্কতায় বলেছে বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সহায়তায় অর্থায়ন কমতে থাকায় প্রায় ৮৩ লাখ শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষ জরুরি সহায়তা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
প্রয়োজন সাড়ে ৮ বিলিয়ন, মিলেছে ৩২ শতাংশ
ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, ২০২৪ সালে সংস্থাটি ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অনুদান পেয়েছিল। ২০২৫ সালে তা কমে ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। অথচ শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তার প্রয়োজন কমেনি।
চলতি বছর শরণার্থীদের সুরক্ষা ও সহায়তার জন্য ইউএনএইচসিআরের প্রয়োজন অন্তত ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু জুলাই পর্যন্ত সংস্থাটি পেয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যা প্রয়োজনের ৩২ শতাংশ।
ইউএনএইচসিআরের এক্সটারনাল রিলেশনস প্রধান ডমিনিক হাইড সতর্ক করেছেন, সুরক্ষামূলক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের নিচে নেমে গেলে শুধু কম মানুষ সেবা পাবেন এমন নয়, কিছু কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
অর্থসংকট সামলাতে ইউএনএইচসিআর ২০২৫ সালে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে, যা সংস্থাটির মোট জনবলের এক-চতুর্থাংশের বেশি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা দেশগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্র বৈদেশিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। একই সঙ্গে অন্য বড় দাতাদের অর্থায়নেও চাপ তৈরি হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের জন্যও ছোট হচ্ছে সহায়তার পরিসর
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটে অর্থায়নের চাপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মানুষের জন্য ৯৩৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছিল। অর্থের ঘাটতির কারণে পরে জীবনরক্ষাকারী অগ্রাধিকার কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ৪৫৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলারে সীমিত করতে হয়।
২০২৬ সালে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো প্রায় ১৫ লাখ ৬০ হাজার রোহিঙ্গা ও স্থানীয় মানুষের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার চেয়েছে। এটি ২০২৫ সালের মূল আবেদনের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম। জাতিসংঘ বলছে, কমিয়ে আনা এই পরিকল্পনাও মূলত জীবনরক্ষাকারী ন্যূনতম কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে তৈরি।
এর মধ্যে খাদ্যের জন্য ২৪৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন, আশ্রয়ের জন্য ১২৮ মিলিয়ন, পানি ও পয়োনিষ্কাশনে ৬১ দশমিক ২ মিলিয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবায় ৪৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের প্রয়োজন কমেনি; বরং অর্থের প্রাপ্যতার সঙ্গে মিলিয়ে সহায়তার পরিসর ছোট করতে হচ্ছে।
কীভাবে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ
আন্তর্জাতিক সহায়তা এক ডলার কমলে বাংলাদেশ সরকারকে সেই এক ডলার দিতে হবে, হিসাবটি এত সরল নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কার্যক্রম কমাতে পারে, নতুন দাতা পাওয়া যেতে পারে অথবা সীমিত অর্থ সবচেয়ে জরুরি খাতে সরিয়ে নেওয়া হতে পারে। তারপরও দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন কমতে থাকলে বাংলাদেশের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ বাড়তে পারে।
রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক অর্থে শুধু খাবার দেওয়া হয় না। স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, আশ্রয়, শিক্ষা, নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মতো কার্যক্রমও চলে। এসব সেবা সংকুচিত হলে বিদ্যমান সরকারি সেবা ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরির ঝুঁকি রয়েছে।
এর প্রভাব কেবল শিবিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০২৬ সালের পরিকল্পনায় কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্যও ৩৬ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ কমলে রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন ও সহায়তা কর্মসূচিও সংকুচিত হতে পারে।

প্রত্যাবাসন নেই, মানুষ বাড়ছে
অর্থায়নের সংকটকে বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। ইউএনএইচসিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সংগঠিত প্রত্যাবাসন না হলে স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ২০২৯ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়াতে পারে।
ফলে সমীকরণটি বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই কঠিন হচ্ছে—প্রত্যাবাসন হচ্ছে না, মানুষের সংখ্যা বাড়তে পারে, অথচ আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমলে বাংলাদেশের বাজেটে ঠিক কত অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হবে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাব এখনো নেই। ফলে বৈশ্বিক অর্থসংকটের পুরো ঘাটতি বাংলাদেশ সরকারকেই বহন করতে হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ইউএনএইচসিআরের ৮৩ লাখ শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সহায়তা হারানোর সতর্কতা তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বৈশ্বিক মানবিক সংকটের খবর নয়। প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসনের পথ অনিশ্চিত থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক অর্থায়নও যদি দীর্ঘমেয়াদে কমতে থাকে, তাহলে প্রশ্নটি ক্রমেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
নবোদয়/ কেএ/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬