Loading...

জেলায় জেলায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যার পর একের পর এক জেলায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলছে। কয়েক রাতের অভিযানে আটক হয়েছেন বহু মানুষ। কিন্তু যাচাইয়ের পর তাদের বড় অংশকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।


কুমিল্লায় স্কুলছাত্র অপ্রতিম হত্যার পর একের পর এক জেলায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চলছে। কয়েক রাতের অভিযানে আটক হয়েছেন বহু মানুষ। কিন্তু যাচাইয়ের পর তাদের বড় অংশকে অভিভাবকের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অপরাধে জড়িতদের শনাক্ত ও বিচারের পাশাপাশি সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন: কিশোরদের গ্যাংয়ে টানছে কারা, আর থানা থেকে বাড়ি ফেরার পর তাদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কী ব্যবস্থা আছে?
কুমিল্লায় গত বুধবার ১৮ থানা এলাকায় অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকের কাছে দেওয়া হয়; ১৭৩ জনকে পাঠানো হয় আদালতে। শনিবার আটক ২৫৪ জনের মধ্যে ১৪৬ জন ছাড়া পান, আদালতে তোলা হয় ১০৮ জনকে। রবিবার আরও ৪১৫ জনকে আটক করে পুলিশ। সোমবার পর্যন্ত তাদের বিষয়ে যাচাই চলছিল। অপ্রতিম হত্যায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান বাড়ানো হয়।
চট্টগ্রামের ১৭ থানা এলাকায় রবিবার রাতে আটক ৪৪৫ জনের মধ্যে ৩৫৪ জন কিশোর; অন্য অভিযোগে আটক হন আরও ৯১ জন। যাচাই শেষে ২৯৩ কিশোরকে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়। বাকি ৬১ কিশোরের বিরুদ্ধে অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই রাতে লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় আটক ২৬৬ জনের মধ্যে ২১৪ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় ছাড়া হয়। অন্য ৫২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা, ধর্ষণ ও মাদকসহ বিভিন্ন মামলায় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় পুলিশ।
চাঁদপুরের আট উপজেলায় আটক ৩৭০ জনের মধ্যে ৩৫৫ জনকে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে; বাকি ১৫ জনের বিষয়ে যাচাই চলছিল। ফলে অভিযানে আটক হওয়া সবাইকে ‘কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য’ বলা যায় না। কোথাও সন্দেহভাজন কিশোর, কোথাও অন্য মামলার আসামিও একই হিসাবের মধ্যে রয়েছেন। আটকসংখ্যা দিয়ে অভিযানের ব্যাপ্তি বোঝা যায়, অপরাধে জড়িতদের প্রকৃত সংখ্যা নয়।

কাউকে থানায় আনা, যাচাইয়ের পর ছেড়ে দেওয়া, মামলা দেওয়া এবং আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া—এগুলো আলাদা ধাপ। সন্দেহের ভিত্তিতে আটক কোনো কিশোরকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করলে তার পড়াশোনা ও সামাজিক জীবনে প্রভাব পড়তে পারে। আবার সহিংসতা বা মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলে তার তদন্তও প্রয়োজন। তাই অভিযানের পর কতজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মামলা হচ্ছে এবং কতজন শিশু সহায়তা পাচ্ছে, সেই হিসাব জানা জরুরি।
কিশোরেরা কেন এসব দলে যায়, তার একটিমাত্র ব্যাখ্যা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, স্কুলে অনাগ্রহ, অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের প্রভাব, মাদকের সংস্পর্শ, পরিবারে সহিংসতা বা নজরদারির ঘাটতি এবং এলাকায় অপরাধের সুযোগ তরুণদের সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এসব ঝুঁকি থাকলেই কেউ অপরাধে জড়াবে, এমন নয়। কোনো এলাকায় প্রভাব দেখানোর আকাঙ্ক্ষা এবং বড়দের আশ্রয়ে অর্থ পাওয়ার সুযোগও গ্যাংয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, কোন আচরণ অপরাধ, তা নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা কমে গেছে। বয়সজনিত পরিবর্তনের সময়ে শিক্ষার্থীদের গঠনমূলক পথে রাখার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিতে হবে। শুধু পরিবারকে দায়ী করলে অপরাধে শিশুদের ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকাও আড়ালে থেকে যায়।
গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও পৃষ্ঠপোষকেরা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। সদস্য আটক বা এলাকায় আড্ডা ভেঙে দেওয়া তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হতে পারে; চাঁদাবাজি, মাদক কিংবা আধিপত্য বিস্তারে কিশোরদের ব্যবহার বন্ধ করতে তাদের অর্থ ও অস্ত্র জোগানো ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে। ‘কিশোর গ্যাং’ নাম থাকলেও এসব দলের সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক নন।

আটক ও গ্রেপ্তারের পরের পথও সবার এক নয়। শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছর পর্যন্ত প্রত্যেকে শিশু। অভিযোগে কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার করা হলে অভিভাবক ও প্রবেশন কর্মকর্তাকে জানাতে হয়। অভিযোগের ধরন এবং শিশুর পরিস্থিতি বিবেচনায় শিশুবিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা সতর্ক করে মুক্তি দিতে বা আনুষ্ঠানিক বিচারের বিকল্প পথে পাঠাতে পারেন। মুক্তি বা জামিন সম্ভব না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাকে শিশু আদালতে হাজির করতে হয়। এরপর আদালত জামিন, নিরাপদ স্থান বা শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে কাউন্সেলিং, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা গড়ে তোলার ব্যবস্থা থাকার কথা জানিয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। আদালত উপযুক্ত মনে করলে শিশুকে প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিবারে রাখার পথও রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অভিযানে অভিভাবকের জিম্মায় ছাড়া কিশোরেরা নিয়মিত পরামর্শ বা সহায়তা পাচ্ছে কি না, প্রকাশিত তথ্য থেকে তা জানা যায় না। মুচলেকায় ছাড়া পাওয়াই দীর্ঘ মেয়াদে অপরাধ থেকে দূরে থাকার নিশ্চয়তা নয়।
প্রতিরোধের একটি ধাপ দেখা গেছে চট্টগ্রামে: সন্তান কার সঙ্গে মেশে, কোথায় যায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে ব্যবহার করে, তা খেয়াল রাখতে অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিশুদের নিজেদেরও ঝুঁকি চিনতে শেখানো প্রয়োজন। বিরোধ মেটানোর অহিংস উপায়, গ্যাংয়ে যোগ দেওয়ার চাপ সামলানো এবং বিপদে বিশ্বস্ত বড়দের সহায়তা চাওয়া—এসব শেখাতে স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি ও পরিবারকে যুক্ত করার সুপারিশ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এই আলোচনার মধ্যেই সোমবার ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে ২১ বছর বয়সি সবুজ হোসেন আরমানকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে এসআরবি-২। কেরানীগঞ্জের আরশিনগরে ১৫ সেপ্টেম্বর ফরহাদ হত্যার মামলায় তিনি এজাহারভুক্ত আসামি। তাকে গ্রেপ্তারের পর ধারালো অস্ত্র, একটি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধারের দাবি করেছে বাহিনী। আরমান প্রাপ্তবয়স্ক।
কারওয়ান বাজারে সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নায়মুল হাসান বলেন, গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের গ্রেপ্তার করলে দলগুলো দুর্বল হয়। তবে ‘শর্টকাট’ সমাধানে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। এসব দল কেন গড়ে ওঠে এবং তাদের কার্যক্রম কীভাবে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে বাহিনীর গবেষণা ও উন্নয়ন সেল কাজ করছে বলে জানান তিনি। এখন অভিযানের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও নিয়মিত সহায়তার ব্যবস্থা কতটা পৌঁছায়, সেটিই দেখার বিষয়।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬