Loading...

বিটা পিক্টোরিস বি
প্রথমবার সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রেডিও নিঃসরণ শনাক্ত; ধরা পড়েছে শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রেরও ইঙ্গিত।


পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে থাকা একটি গ্রহ থেকে আসা রেডিও তরঙ্গ প্রথমবারের মতো সরাসরি শনাক্ত করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। সংকেতটি কোনো এলিয়েন সভ্যতার পাঠানো বার্তা নয়। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি ওই গ্রহের মেরু অঞ্চলে তৈরি হওয়া এক ধরনের প্রাকৃতিক অরোরা বা মেরুজ্যোতির সঙ্গে সম্পর্কিত রেডিও নিঃসরণ।
তবে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে। এই রেডিও তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি সরাসরি নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রহটির নাম বিটা পিক্টোরিস বি। এটি কোনো ছোট, পৃথিবীর মতো পাথুরে গ্রহ নয় বরং একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ, যার ভর বৃহস্পতির কয়েক গুণ এবং বয়স আনুমানিক ২ কোটি বছরের কিছু বেশি। তুলনায় আমাদের সৌরজগতের বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। অর্থাৎ মহাজাগতিক হিসাবে এটি এখনো একটি অত্যন্ত তরুণ গ্রহ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, বিটা পিক্টোরিস নক্ষত্রমণ্ডল পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে এবং এই গ্রহটি তার নক্ষত্রকে প্রায় ২২ বছরে একবার প্রদক্ষিণ করে।
রেডিও তরঙ্গটি ধরা পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার মীরক্যাট রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে। এটি সাধারণ অপটিক্যাল টেলিস্কোপের মতো দৃশ্যমান আলো দিয়ে গ্রহের ছবি তুলছিল না; বরং মহাকাশ থেকে আসা রেডিও তরঙ্গের অত্যন্ত দুর্বল নিঃসরণ শনাক্ত করছিল।
গবেষকেরা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত চারটি পর্যবেক্ষণ পর্বে বিটা পিক্টোরিস ব্যবস্থাকে দেখেন। ০.৮৫ থেকে ৩.৫ গিগাহার্টজ পর্যন্ত বিভিন্ন কম্পাঙ্কে দ্রুত, পুনরাবৃত্ত এবং প্রবলভাবে বৃত্তাকার মেরুকৃত রেডিও বিস্ফোরণ ধরা পড়ে।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে কঠিন কাজটি ছিল। রেডিও টেলিস্কোপে কোনো একটি নক্ষত্রমণ্ডল থেকে সংকেত ধরা পড়লেই বলা যায় না যে সেটি ঠিক কোন গ্রহ থেকে এসেছে। একই এলাকায় থাকা নক্ষত্রও রেডিও তরঙ্গ তৈরি করতে পারে।
তাই গবেষকেরা আকাশের অত্যন্ত দূরের কয়েকটি কোয়াসারকে স্থির reference point হিসেবে ব্যবহার করে রেডিও ছবির অবস্থান ঠিক করেন। সেই হিসাবের পর দেখা যায়, রেডিও উৎসটির অবস্থান বিটা পিক্টোরিস বি-এর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে, নক্ষত্রটির সঙ্গে নয়। নক্ষত্রের অবস্থান থেকে উৎসটির বিচ্যুতিকে গবেষকেরা ৪.৪ সিগমা মাত্রায় পেয়েছেন।
এরপর আসে আরও বিস্ময়কর অংশ। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এই রেডিও তরঙ্গ তৈরি হয়েছে ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন মাজার অস্থিতিশীলতা নামের একটি প্রক্রিয়ায়। সহজ ভাষায়, নক্ষত্র থেকে আসা উচ্চশক্তির আধানযুক্ত কণা গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে।
চৌম্বকক্ষেত্রের রেখা ধরে কিছু কণা গ্রহের মেরু অঞ্চলের দিকে ছুটে গিয়ে ওপরের বায়ুমণ্ডলের কণার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। পৃথিবীর অরোরা বা মেরুজ্যোতির পেছনেও একই ধরনের চৌম্বকীয় প্রক্রিয়া কাজ করে। তবে সেখানে যে আলো দেখা যায়, তার পাশাপাশি এমন প্রক্রিয়ায় রেডিও তরঙ্গও তৈরি হতে পারে।
এই রেডিও তরঙ্গই গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি সম্পর্কে একটি দরজা খুলে দিয়েছে। গবেষকেরা সর্বোচ্চ শনাক্ত করা কম্পাঙ্ক থেকে বিটা পিক্টোরিস বি-এর সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে অন্তত ১ হাজার ২৫০ গস চৌম্বকক্ষেত্র থাকার হিসাব করেছেন।
পৃথিবীর পৃষ্ঠের চৌম্বকক্ষেত্র প্রায় ০.৫ গসের কাছাকাছি। অর্থাৎ এই হিসাব অনুযায়ী বিটা পিক্টোরিস বি-এর ক্ষেত্রটি পৃথিবীর তুলনায় অন্তত কয়েক হাজার গুণ শক্তিশালী। বৃহস্পতির ক্ষেত্রের সঙ্গেও এটি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী।

কিন্তু গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের এত আগ্রহ কেন? কারণ কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল টিকে থাকার ক্ষেত্রে চৌম্বকক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নক্ষত্র থেকে সবসময়ই আধানযুক্ত কণার প্রবাহ আসে, যাকে সৌর বায়ু বা stellar wind বলা হয়। শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র এসব কণার সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষামূলক বাধা তৈরি করতে পারে। ফলে কোনো গ্রহ দীর্ঘ সময় ধরে তার বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পারবে কি না, সেই গবেষণায় চৌম্বকক্ষেত্র গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
বিটা পিক্টোরিস বি নিজে অবশ্য প্রাণের সন্ধানের জন্য পৃথিবীর মতো কোনো সম্ভাব্য আবাসযোগ্য গ্রহ নয়। এটি বিশাল একটি গ্যাসীয় গ্রহ এবং তার পরিবেশ পৃথিবীর সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই আবিষ্কারের আসল গুরুত্ব অন্য জায়গা।
বিজ্ঞানীরা যদি একটি দূরবর্তী গ্রহের রেডিও অরোরা শনাক্ত করে তার চৌম্বকক্ষেত্রের শক্তি বের করতে পারেন, ভবিষ্যতে একই কৌশল ছোট ও অপেক্ষাকৃত পৃথিবীসদৃশ গ্রহের ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। তখন কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল ধরে রাখার সক্ষমতা এবং সম্ভাব্য বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
এখানে এলিয়েন প্রসঙ্গটিও পরিষ্কার করা জরুরি। রেডিও তরঙ্গ মানেই কোনো সভ্যতা বার্তা পাঠিয়েছে এমন নয়। মহাকাশে প্রাকৃতিকভাবেও অসংখ্য রেডিও তরঙ্গ তৈরি হয়। এই নির্দিষ্ট ঘটনায় গবেষকেরা যে নিঃসরণ শনাক্ত করেছেন, সেটিকে প্রাকৃতিক অরোরাল রেডিও বিকিরণ হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন। কোনো কৃত্রিম সংকেত, বার্তার কাঠামো বা প্রযুক্তিগত উৎসের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে আবিষ্কারটি যে কারণে ইতিহাসে জায়গা করে নিতে পারে, তা হলো এই প্রথম কোনো বহির্গ্রহের রেডিও নিঃসরণকে তার নিজস্ব অবস্থানের সঙ্গে এত পরিষ্কারভাবে যুক্ত করার দাবি করা হয়েছে। এর ফলে এতদিন দূর থেকে অনুমান করতে হওয়া একটি বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণযোগ্য হয়ে উঠছে।
আর যদি ভবিষ্যতের আরও শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ একই পদ্ধতিতে আরও গ্রহের সংকেত ধরতে পারে, তাহলে মহাবিশ্বে শুধু কতগুলো গ্রহ আছে তা নয়, কোন গ্রহের চারপাশে কী ধরনের অদৃশ্য প্রতিরক্ষাবলয় রয়েছে, সেটিও হয়তো জানা সম্ভব হবে।
৬৩ আলোকবর্ষ দূরের সেই গ্রহ থেকে পৃথিবীতে পৌঁছানো রেডিও তরঙ্গ তাই কোনো এলিয়েনের চিঠি নয়। বরং এটি এমন একটি মহাজাগতিক স্বাক্ষর, যার ভেতর থেকে বিজ্ঞানীরা প্রথমবার একটি দূরবর্তী গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের খবর পড়তে শুরু করেছেন।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬