Loading...

যা ঘটল সাত দিনে
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের আলোচনায় একসঙ্গে উঠে এসেছে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি বড় ঘটনা। সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। ডেঙ্গুতে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কয়েক মাস ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাবেও মৃত্যু ও সংক্রমণ বাড়ছে। এর মধ্যেই পাঁচটি নতুন ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।


সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশের আলোচনায় একসঙ্গে উঠে এসেছে অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি বড় ঘটনা। সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। ডেঙ্গুতে দৈনিক হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কয়েক মাস ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাবেও মৃত্যু ও সংক্রমণ বাড়ছে। এর মধ্যেই পাঁচটি নতুন ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সাময়িক ব্যবস্থা নয়, দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাই এখন বড় হয়ে সামনে আসছে।
জ্বালানিতে ২০ টাকার ধাক্কা
২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। ফলে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকায় দাঁড়ায়।
সরকারের ব্যাখ্যা, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান দ্রুত বেড়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে সরকার। শুধু ডিজেলেই বর্তমান আন্তর্জাতিক দামে বিপিসির লিটারে প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারে আটকে নেই।
বাংলাদেশে আমদানি করা ডিজেলের ওপর শুল্ক ও কর মিলিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব আদায় হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজেলের ওপর বর্তমানে ৬ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি, ১৫ শতাংশ ভ্যাট, ২ শতাংশ অগ্রিম কর ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইনভয়েস মূল্যের ওপর কর হিসাব হওয়ায় সরকারের কর আদায়ও বেড়েছে।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে, বিপিসির লোকসান বেড়েছে, কিন্তু সেই একই সময়ে আমদানি পর্যায়ে সরকারের করের অঙ্কও বেড়েছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়ির মালিকের খরচে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ বাড়লে খাদ্যসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে। ডিজেলনির্ভর সেচ ও কৃষিযন্ত্রের খরচও বাড়বে। এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়তে পারে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সময় কর কমানোর সুযোগ জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের কাঠামোর মধ্যেই থাকা উচিত।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা, বিপিসির পরিচালন দক্ষতা, ক্রয় ও বিতরণব্যবস্থার খরচ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ডেঙ্গু: আক্রান্তের সঙ্গে বাড়ছে ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন
২২ সেপ্টেম্বর এক দিনে ১ হাজার ৮৭২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন, যা তখন পর্যন্ত ২০২৬ সালের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা। পরদিন আরও ১ হাজার ৮৬৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবে বছরের মোট হাসপাতালে ভর্তি রোগী দাঁড়ায় ৬৭ হাজার ৩৬৭ এবং মৃত্যু ২০১ জন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট কবিরুল বাশার বলেছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি ও অনুকূল তাপমাত্রা এডিস মশার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এর সঙ্গে রয়েছে কার্যকর, তথ্যভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণের অভাব। এডিস এখন জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, কোন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বেশি তা শনাক্ত করে সেখানে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে এখনো প্রচলিত ফগিং ও সাধারণ লার্ভিসাইড প্রয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে। অথচ মশার প্রকৃত প্রজননস্থলে ব্যবস্থা না নিলে রাস্তায় ধোঁয়া ছড়িয়ে খুব বেশি লাভ হয় না।
প্রতিকারের পথ
প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিয়মিত এনটোমোলজিক্যাল সার্ভে করে মশার হটস্পট চিহ্নিত করা। এরপর এলাকা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুধু ঢাকা নয়, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মশা নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। পর্যাপ্ত এনটোমোলজিস্ট নিয়োগ এবং বেসরকারি হাসপাতালসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ডেঙ্গু তথ্য একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি ব্যবস্থায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা, জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা এবং রোগীর অবস্থার অবনতি পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে হাসপাতালে আসাকেও মৃত্যুর একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।
হামের প্রাদুর্ভাব: কয়েক বছরের টিকাদান ঘাটতির মূল্য
২৩ সেপ্টেম্বরের সরকারি হিসাবে এক দিনে হাম বা হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৬। এর মধ্যে ১০১টি মৃত্যু পরীক্ষাগারে নিশ্চিত এবং ৯৭৫টি সন্দেহভাজন হিসেবে নথিভুক্ত। একই সময় পর্যন্ত পরীক্ষাগারে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২০ হাজার ৮৫১।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: ১ হাজার ৭৬টি মৃত্যুকে সবগুলো ‘নিশ্চিত হাম মৃত্যু’ বলা ঠিক হবে না। সরকারি তথ্যেই নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যু আলাদা করা হয়েছে।
প্রাদুর্ভাবের কারণ খুঁজতে গেলে কয়েক বছর পেছনে যেতে হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২০২৪-২৫ সময়ে হাম-রুবেলা টিকার মজুত সংকট, নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি এবং ২০২০ সালের পর নিয়মিত জাতীয় পর্যায়ের সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচির অভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রোগটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধক্ষমতা পায়নি।
ইউনিসেফের হিসাবে, দ্বিতীয় ডোজ হাম-রুবেলা টিকার কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৯ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছিল। হাম ঠেকাতে সাধারণভাবে দুই ডোজ টিকার কভারেজ প্রায় ৯৫ শতাংশে রাখা প্রয়োজন।
ডিজিটাল ব্যাংক: সুযোগ যত বড়, ঝুঁকিও তত বাস্তব
স্বাস্থ্য ও মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক খবরের মধ্যেই সপ্তাহে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বড় একটি পরিবর্তনের পথ খুলেছে।
২৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক পাঁচটি প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংককে প্রাথমিক অনুমোদন বা লেটার অব ইনটেন্ট দিয়েছে। এগুলো হলো বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক, রবির মূল প্রতিষ্ঠান আজিয়াটার উদ্যোগে বুস্ট ডিজিটাল ব্যাংক, বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ার গ্রুপের নোভা ডিজিটাল ব্যাংক, ডিকে ডিজিটাল ব্যাংক এবং কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক।
এটি এখনো চূড়ান্ত ব্যাংকিং লাইসেন্স নয়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যান্য শর্ত পূরণ করার পর পূর্ণ লাইসেন্সের জন্য মূল্যায়ন পেরোতে হবে।
ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো প্রচলিত শাখা থাকবে না। অ্যাপ ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হবে। বড় শিল্পঋণ বা এলসি খোলার অনুমতি না দিয়ে ছোট ঋণগ্রহীতাদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের মতে, এর মাধ্যমে প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আনার সুযোগ রয়েছে। তবে একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের আর্থিক সচেতনতার দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানিতে আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার আগে মূল্য ও কর কাঠামো কতটা প্রস্তুত ছিল, ডেঙ্গুতে মশার হটস্পট কতটা বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে শনাক্ত হচ্ছে, হামে টিকাদানের ঘাটতি কয়েক বছর ধরে কেন জমেছে, আর ডিজিটাল ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি বিস্তারের আগেই সাইবার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো কতটা শক্ত করা হচ্ছে, আগামী দিনের ফল অনেকটাই নির্ভর করবে এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপর।
নবোদয়/ কেএ/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬