Loading...

‘আওয়ামী দোসর’ ধরলে পুরস্কার
‘আওয়ামী শক্তির দোসরদের’ আইনের আওতায় আনতে পারলে পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এই ঘোষণা এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, আইনি প্রশ্নও তুলছে। কারণ বাংলাদেশের আইনে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নির্দিষ্ট অপরাধ, যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা আইনে স্বীকৃত সন্দেহের ভিত্তিতে।


‘আওয়ামী শক্তির দোসরদের’ আইনের আওতায় আনতে পারলে পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এই ঘোষণা এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, আইনি প্রশ্নও তুলছে। কারণ বাংলাদেশের আইনে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে নির্দিষ্ট অপরাধ, যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা আইনে স্বীকৃত সন্দেহের ভিত্তিতে। কোনো অস্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় নিজে গ্রেপ্তারের স্বতন্ত্র আইনি ভিত্তি নয়।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে পুলিশ সপ্তাহের পদক প্রদান অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, যারা ‘ফ্যাসিবাদের, আওয়ামী শক্তির দোসরদের’ আইনের আওতায় আনতে পারবে, তাদের পুরস্কৃত করা হবে। তিনি সাম্প্রতিক কয়েকটি গ্রেপ্তারের উদাহরণ টেনে পুলিশের গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও ব্যবহারের কথা বলেন।
ঘোষণার দিনই জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালায় পুলিশ। বিভিন্ন গণমাধ্যমের হিসাবে সেখানে প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। যাচাই শেষে অন্তত ২৪৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়; ২৭ জনকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশের আবেদনে বলা হয়, তাদের বিরুদ্ধে একটি আমলযোগ্য অপরাধে জড়িত থাকার প্রাথমিক সন্দেহ রয়েছে। তবে মন্ত্রীর পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে ওই অভিযানের সরাসরি কার্যকারণ সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।
এখানেই প্রশ্ন হলো- ‘আওয়ামী দোসর কে? সরকার বা পুলিশ এই শব্দের কোনো প্রকাশ্য, নির্দিষ্ট আইনগত সংজ্ঞা দিয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অথচ গ্রেপ্তার রাষ্ট্রের সবচেয়ে কঠোর ক্ষমতাগুলোর একটি। সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন ছাড়া কারো জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির বিরুদ্ধে ক্ষতিকর ব্যবস্থা নেওয়া যায় না এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যায় না। ৩৩ অনুচ্ছেদে গ্রেপ্তারের কারণ জানানো এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করার সুরক্ষা রয়েছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারাও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের শর্ত নির্দিষ্ট করেছে। সেখানে যুক্তিসঙ্গত অভিযোগ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের পাশাপাশি গ্রেপ্তার কেন প্রয়োজন, তারও আইনি ভিত্তি থাকতে হয়। ৫৪এ ধারায় গ্রেপ্তারের কারণ জানানো বাধ্যতামূলক; ৬১ ও ১৬৭ ধারায় ২৪ ঘণ্টার বেশি আটক রাখতে বিচারিক অনুমোদন দরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষিত পুরস্কার প্রশাসনিক প্রণোদনা হতে পারে, কিন্তু সেটি আইনের শর্তকে সরিয়ে দিতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বদরুল আহসান কচি বলেছেন, রাজনৈতিক তকমার কারণে কাউকে নাগরিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করার অনুমতি সংবিধান দেয় না। ব্যবস্থা নিতে হলে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও প্রমাণ থাকতে হবে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী ফারান মো. আরাফও বলেছেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করতে হলে আইনে নির্ধারিত কারণ ও প্রক্রিয়া মানতে হবে। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ নির্বিচার গ্রেপ্তার বা আটক নিষিদ্ধ করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিটির ব্যাখ্যায়, কোনো আটক দেশীয় আইনে অনুমোদিত হলেও তা অযৌক্তিক, অপ্রয়োজনীয়, অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা যথাযথ প্রক্রিয়াবিহীন হলে নির্বিচার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
পুলিশকে পুরস্কৃত করার নজির বাংলাদেশে নতুন নয়। ২০১৫ সালে অগ্নিসংযোগ, ককটেল বিস্ফোরণ ও সহিংসতার মতো নির্দিষ্ট অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে তথ্য বা গ্রেপ্তারের জন্য নগদ পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান ঘোষণার পার্থক্য হলো, এখানে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এসেছে একটি রাজনৈতিকভাবে পরিচয়বাচক ও অস্পষ্ট শব্দ। ফলে পুরস্কার কি নির্দিষ্ট অপরাধের তদন্তকে উৎসাহিত করবে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় শনাক্ত করাই কর্মদক্ষতার সূচক হয়ে উঠবে, সেই প্রশ্ন উঠছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এটিই প্রথম বিতর্ক নয়। ১৪ জুন ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত নেতা জিসান মিয়া প্রধানের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও জোরপূর্বক গর্ভপাতের অভিযোগের বিস্তারিত তিনি সংসদে তুলে ধরলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান এবং বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলেন। তখন ঘটনাটি তদন্তাধীন ছিল।

১৮ জুন সংসদ সদস্যদের ঋণখেলাপি হওয়া নিয়ে তার আইনি ব্যাখ্যার পাল্টা জবাব দেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। জুনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এবং সেপ্টেম্বরে গুম প্রতিরোধ বিলের আলোচনায়ও তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান ও কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আরেকটি প্রশ্ন পুলিশ সংস্কার নিয়ে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক পুলিশ গড়ার সংস্কার অসম্পূর্ণ রেখে পুরস্কারভিত্তিক গ্রেপ্তার নীতি উল্টো প্রণোদনার সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাদের আশঙ্কা, কোন গ্রেপ্তার সফল বলে গণ্য হবে, কে পুরস্কার নির্ধারণ করবে, কী প্রমাণের ভিত্তিতে তা দেওয়া হবে এবং ভুল বা অযৌক্তিক গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে দায় কার হবে, এসব স্পষ্ট না থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে পুরস্কারের কোনো বিস্তারিত লিখিত মানদণ্ডের উল্লেখও মেলেনি।
তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য কি আইনসিদ্ধ? বক্তব্যটি যদি এমনভাবে প্রয়োগ হয়, যাতে ‘দোসর’ পরিচয়ই গ্রেপ্তারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধির সুরক্ষার সঙ্গে সংঘাতে পড়তে পারে। বৈধ পথ হলো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ব্যক্তির নির্দিষ্ট কাজ, অপরাধের অভিযোগ, প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া।
এই বিতর্কের কেন্দ্র তাই শুধু আওয়ামী লীগ নয়; রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাও। নিষিদ্ধ কার্যক্রম, সহিংসতা বা নির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগে আইন প্রয়োগ করা সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধের বদলে পরিচয়কে কেন্দ্র করে পুলিশি প্রণোদনা তৈরি হলে আইন প্রয়োগ ও রাজনৈতিক শ্রেণিবিন্যাসের মাঝের রেখাটি ঝাপসা হয়। এখন দেখার বিষয়, সরকার ‘দোসর’ শব্দের কার্যকর আইনি মানদণ্ড ব্যাখ্যা করে কি না, পুরস্কারের লিখিত নীতিমালা প্রকাশ করে কি না এবং প্রতিটি গ্রেপ্তারে অপরাধভিত্তিক প্রমাণ ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত হয় কি না।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০১ অক্টোবর ২০২৬