Loading...

শরীরের ‘ঘড়ি’ কী করছে
সাপ্তাহিক ছুটিতে অ্যালার্ম বন্ধ। ঘুম একটু বেশি, রাত জাগাও হয়তো বেশি। খাবারের সময় বদলায়, চলাফেরা কমে কিংবা বেড়ে যায়। এরপর ছুটি শেষ। আবার নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, যানজট, অফিসের তাড়া, জমে থাকা কাজ আর মানসিক চাপ।


সাপ্তাহিক ছুটিতে অ্যালার্ম বন্ধ। ঘুম একটু বেশি, রাত জাগাও হয়তো বেশি। খাবারের সময় বদলায়, চলাফেরা কমে কিংবা বেড়ে যায়। এরপর ছুটি শেষ। আবার নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠা, যানজট, অফিসের তাড়া, জমে থাকা কাজ আর মানসিক চাপ।
এই পরিবর্তনগুলোকে আমরা সাধারণত ‘ছুটি শেষের ধাক্কা’ হিসেবেই দেখি। কিন্তু গবেষণা বলছে, শরীরের জন্য বিষয়টি শুধু মেজাজ খারাপের গল্প নয়। সপ্তাহের কর্মব্যস্ততা শুরু হওয়ার সময় গুরুতর হৃদরোগের কিছু ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দিন হার্ট অ্যাটাক ঘটায় না। বরং ঘুমের ছন্দে পরিবর্তন, শরীরের জৈবঘড়ি, সকালের শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন এবং মানসিক চাপের মতো একাধিক বিষয় একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
যে গবেষণা থেকে ‘সাপ্তাহিক ছুটির পরেরি ঝুঁকি’ আলোচনায়
২০২৩ সালে ব্রিটিশ কার্ডিওভাসকুলার সোসাইটির সম্মেলনে উপস্থাপিত একটি গবেষণায় আয়ারল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ১০ হাজার ৫২৮ রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তারা ST-segment elevation myocardial infarction বা STEMI নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। STEMI এমন এক ধরনের গুরুতর হার্ট অ্যাটাক, যেখানে হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী প্রধান করোনারি ধমনির একটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
গবেষণায় দেখা যায়, সাপ্তাহিক ছুটির পরের দিন STEMI-এর ঘটনা প্রত্যাশিত সংখ্যার তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। ছুটির দিনও কিছুটা বাড়তি প্রবণতা পাওয়া যায়। গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া বেলফাস্ট হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল কেয়ার ট্রাস্টের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জ্যাক লাফান বলেন, কর্মসপ্তাহের শুরু ও STEMI-এর মধ্যে শক্তিশালী পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে কারণটি সম্ভবত একক নয়; শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়িও ভূমিকা রাখতে পারে বলে তার ধারণা।
ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের তৎকালীন মেডিকেল ডিরেক্টর অধ্যাপক স্যার নিলেশ সামানিও সতর্ক করেছিলেন, গবেষণাটি সময়ের সঙ্গে গুরুতর হার্ট অ্যাটাকের সম্পর্কের প্রমাণ বাড়ালেও সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কেন এ পার্থক্য তৈরি হয়, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
বাংলাদেশে তাহলে রবিবার?
বাংলাদেশে সাধারণ সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও শনিবার। তাই প্রশ্ন উঠতে পারে, এখানেও কি ছুটির পর প্রথম কর্মদিবস রবিবারে একই প্রবণতা থাকার কথা? আয়ারল্যান্ডের ফল বাংলাদেশের ওপর বসিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না। কর্মঘণ্টা, ছুটির ধরন, ঘুমের অভ্যাস, খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনকি মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতও এক নয়। যে প্রক্রিয়াগুলোকে গবেষকেরা সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে দেখছেন, সেগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

ঘুমের সময় বদলানোটা এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
এর শক্তিশালী ইঙ্গিত মিলেছে আরও সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ২০২৫ সালে Journal of Epidemiology and Community Health-এ প্রকাশিত গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ৭২ হাজার ২৬৯ প্রাপ্তবয়স্ক লোকের ঘুমের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা কবজিতে অ্যাকসেলেরোমিটার পরেছিলেন, ফলে শুধু ‘কত ঘণ্টা ঘুমান’ জিজ্ঞেস করার বদলে তাদের ঘুম ও জাগরণের সময় বাস্তবে পরিমাপ করা সম্ভব হয়েছিল।
প্রায় আট বছরের অনুসরণে গবেষকেরা দেখেন, নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা ব্যক্তিদের তুলনায় সবচেয়ে অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস থাকা ব্যক্তিদের বড় ধরনের হৃদরোগজনিত ঘটনার ঝুঁকি ২৬ শতাংশ বেশি ছিল। শুধু হার্ট অ্যাটাক বিবেচনা করলে বিষয়টি ছিল প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, পর্যাপ্ত ঘণ্টা ঘুমিয়েও অত্যন্ত অনিয়মিত ঘুমের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি।
শরীরের ‘ঘড়ি’ কী করছে?
মানুষের শরীর ঘড়ি দেখে কাজ না করলেও নিজের একটি ঘড়ি আছে। সার্কাডিয়ান রিদম নামে পরিচিত প্রায় ২৪ ঘণ্টার এই জৈবিক ছন্দ ঘুম, হরমোন নিঃসরণ, রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন এবং বিপাকের মতো বহু প্রক্রিয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ করে।
২০২৪ সালে npj Cardiovascular Health-এ প্রকাশিত একটি পর্যালোচনা গবেষণায় বলা হয়, রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন দিনের বিভিন্ন সময়ে স্বাভাবিকভাবেই ওঠানামা করে। ঘুম থেকে জাগার সময় রক্তচাপ, হৃদস্পন্দন এবং কর্টিসল ও অ্যাড্রেনার্জিক কার্যকলাপ বাড়তে পারে। একই সময়ের কাছাকাছি হার্ট অ্যাটাক, আকস্মিক মৃত্যু ও ইস্কেমিক স্ট্রোকের ঘটনাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। দীর্ঘদিন অনিয়মিত ঘুম, শিফটের কাজ বা সামাজিক সময়সূচির সঙ্গে শরীরের ঘড়ির অসামঞ্জস্য হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত।
ফলে ছুটিতে রাত ২টায় ঘুমিয়ে সকাল ১০টায় ওঠা, এরপর কর্মদিবসে হঠাৎ রাত ১১টায় ঘুমিয়ে সকাল ৬টায় ওঠার চেষ্টা শরীরের কাছে নিছক সময়সূচি পরিবর্তন নয়। গবেষণায় এই ধরনের পার্থক্যকে কখনো ‘social jet lag’-এর অংশ হিসেবে দেখা হয়।
চাপ কি হার্ট অ্যাটাক ঘটায়?
মানসিক চাপের সময় sympathetic nervous system সক্রিয় হয়। হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়তে পারে এবং শরীরে স্ট্রেস-সংক্রান্ত হরমোনের পরিবর্তন ঘটে। আগে থেকেই করোনারি ধমনিতে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস বা plaque থাকলে তীব্র শারীরিক বা মানসিক চাপ কিছু মানুষের ক্ষেত্রে একটি ঘটনার ট্রিগার হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
কিন্তু অফিসের মিটিং আছে বলেই সুস্থ করোনারি ধমনি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাবে, এমন সরল সমীকরণ নেই। হার্ট অ্যাটাকের মূল পটভূমিতে সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে ধমনিতে plaque জমা এবং পরে সেই plaque ফেটে রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া থাকে।

তাই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অস্বাভাবিক রক্তের চর্বি, ধূমপান, স্থূলতা বা আগে থেকেই হৃদরোগ থাকা ব্যক্তিরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও তামাক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তশর্করা ও রক্তের চর্বিকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কোন লক্ষণ দেখলে অপেক্ষা নয়
বুকের মাঝখানে চাপ, চেপে ধরা বা ব্যথা হার্ট অ্যাটাকের পরিচিত লক্ষণ। ব্যথা এক বা দুই হাত, পিঠ, ঘাড়, চোয়াল বা পেট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা হালকা লাগা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতাও দেখা দিতে পারে। সবার উপসর্গ একই হয় না।
২০২৫ সালে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিবেদনে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জোর দিয়েছেন, হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে নিজে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা বা পরিস্থিতি ‘দেখি একটু পরে ঠিক হয় কি না’ বলে অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হৃদপিণ্ডে রক্তপ্রবাহ যত দ্রুত ফিরিয়ে আনা যায়, স্থায়ী ক্ষতি কমানোর সুযোগ তত বেশি।
তাহলে ছুটির দিনেও ঘড়ি ধরে ঘুমাতে হবে?
ছুটিতে প্রতিদিনের তুলনায় কয়েক ঘণ্টা দেরিতে ঘুমানো ও ওঠা, তারপর একদিনের মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীত সময়সূচিতে চলে যাওয়া শরীরের ঘুম-জাগরণের ছন্দকে বিঘ্নিত করতে পারে। বর্তমান গবেষণা তাই শুধু পর্যাপ্ত ঘুম নয়, ঘুমের নিয়মকেও গুরুত্ব দেওয়ার দিকে যাচ্ছে।
এর সঙ্গে ধূমপান এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, স্বাস্থ্যকর খাবার, রক্তচাপ-ডায়াবেটিস-কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের ফলোআপই হৃদরোগ প্রতিরোধের প্রতিষ্ঠিত ভিত্তি। মানবদেহ এতটা সুবিধাজনক হলে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক আগেই ছুটি নিয়ে ফেলত।
শেষ পর্যন্ত গবেষণার বার্তা সপ্তাহের কোনো দিনকে ভয় পাওয়া নয়। বরং নিজের ঝুঁকিগুলো বোঝা, ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিনে বড় ধরনের ওঠানামা কমানো এবং হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করা।
নবোদয়/ এসএন/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬