Loading...

শিক্ষায় বৈষম্য ও রাষ্ট্রের প্রতি অনাস্থা
ফ্রান্সের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। আন্দোলনকারীদের দাবির সঙ্গে ধর্ম বা অভিবাসনের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলাম ও অভিবাসনকে দায়ী করেছেন কোনো প্রমাণ ছাড়াই।


ফ্রান্সের উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ বিদ্যালয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা। আন্দোলনকারীদের দাবির সঙ্গে ধর্ম বা অভিবাসনের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অথচ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসলাম ও অভিবাসনকে দায়ী করেছেন কোনো প্রমাণ ছাড়াই। শ্রেণিকক্ষ থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ এখন রাষ্ট্রের শিক্ষানীতি, সামাজিক বৈষম্য এবং তরুণদের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সরকারি হিসাবে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। যদিও আয়োজকদের দাবি, সংখ্যাটি সাড়ে চার লাখ। শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন শিক্ষক, অভিভাবক ও শ্রমিক সংগঠনের সদস্যরা। ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকপদ শূন্য থাকার প্রতিবাদ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে তা বিভিন্ন শহর ও সামাজিক পটভূমির বিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে।
তাৎক্ষণিক দাবিগুলো শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। অনুপস্থিত শিক্ষকের বিকল্প নিয়োগ, অতিরিক্ত ভিড় কমানো, ভবন মেরামত, দুপুরের বিরতি বাড়ানো এবং দীর্ঘ শিক্ষাদিবস পুনর্বিবেচনা। অনেকের সময়সূচি সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। কোথাও পানি চুইয়ে পড়ে, কোথাও ইঁদুরের উপদ্রব। গরমে পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশও থাকে না। সরকারের নিজস্ব আলোচনাতেও অঞ্চলভেদে সুযোগের ব্যাপক পার্থক্য স্বীকার করা হয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া দুবে ল্য মঁদে লিখেছেন, সমস্যাটি অর্থের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ মাধ্যমিকে প্রবেশের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পেশায় পৌঁছানোর সুযোগ সমান হয়নি। একই সামাজিক অবস্থানে পৌঁছাতে আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশি যোগ্যতা প্রয়োজন হচ্ছে। তার বিশ্লেষণে, শিক্ষার্থীরা এমন প্রতিযোগিতায় আটকে পড়ছে, যেখানে ভালো ফল অপরিহার্য, অথচ ভালো ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। এই টানাপোড়েনই ক্ষোভের গভীর ভিত্তি।
উচ্চশিক্ষায় আবেদনের অনলাইন ব্যবস্থা পারকুরসুপও উদ্বেগের উৎস। ইনস্টিটিউট মনতেঁর ১৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিদের নিয়ে জরিপে ৭৭ শতাংশ পারকুরসুপ ব্যবহারের সময় মানসিক চাপের কথা বলেছেন। সমাজবিজ্ঞানী অলিভিয়ে গালঁর মতে, শিক্ষার্থীদের একাংশ নিজেদের পিছিয়ে পড়া মনে করে এবং সম্ভাবনাহীন শিক্ষাপথে ঠেলে দেওয়া হবে বলে ভয় পায়। অর্থাৎ, ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিক্ষার পর কর্মজীবনে নিজের জায়গা খুঁজে পাওয়ার উৎকণ্ঠা।

এই উদ্বেগের পটভূমিতে শ্রমবাজারের বাস্তবতাও রয়েছে। ওইসিডির ২০২৬ সালের শিক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের ১৮ শতাংশ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের কোনোটিতেই ছিলেন না। একই সূচকে ওইসিডির তুলনাযোগ্য দেশগুলোর গড় ১৩ শতাংশ। এ তথ্যের মাধ্যমে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার একটি প্রাসঙ্গিক চিত্র বোঝা যায়।
পুলিশের প্রতিক্রিয়া আন্দোলনে নতুন ক্ষোভ যোগ করেছে। এপির হিসাবে, আন্দোলন শুরুর পর সাড়ে ছয় হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হয়েছে, যাদের অধিকাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। এক কিশোর পুলিশের নিক্ষেপ করা গ্রেনেডে হাত হারিয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুলিশের ব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। ফলে শিক্ষার দাবির পাশাপাশি প্রতিবাদের অধিকার ও শিশুদের নিরাপত্তাও সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী ভাঁসাঁ তিবেরজের বিশ্লেষণে, তরুণদের নাগরিক হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা সংকট বাড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর এই আন্দোলন বিকেন্দ্রীভূত। প্রচলিত ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে আলোচনা করলেই সব শিক্ষার্থীর সম্মতি পাওয়া কঠিন। তিনি মনে করেন, আন্দোলন ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আলোচনায় সরকারি সেবা ও বৈষম্যকে ফিরিয়ে এনেছে। ফলে সরকারকে নিরাপত্তার প্রশ্নের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়েও জবাব দিতে হচ্ছে।
অর্থনৈতিক পটভূমিও সমাধান কঠিন করছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জন্য শিক্ষাবাজেট ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। একই সময়ে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় শিক্ষাকে ছাড়িয়ে সরকারের সবচেয়ে বড় বাজেট খাত হতে যাচ্ছে। দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও বড় ঘাটতির মধ্যে ব্যয় কমানোর চাপ রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রয়োজনীয় মনে হওয়া বিনিয়োগ এবং সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সরাসরি টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। অর্থের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক আস্থা পুনরুদ্ধারের কঠিন প্রশ্ন।
সরকার এখন সংলাপ ও সংস্কারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়া হবে; মাসের শেষে সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের সময়সূচি উপস্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। শিক্ষক বদলি, ভবন, দৈনিক সময়সূচি ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ হবে। তবে শিক্ষা-ইতিহাসবিদ ক্লোদ লেলিয়েভ্রের পর্যবেক্ষণ, সরকারের বাজেটের সুযোগ সীমিত। ফলে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
বিক্ষোভ কতদিন চলবে, তার নির্ভরযোগ্য শেষ তারিখ নেই। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, শুধু আলোচনার ঘোষণা দিয়ে দ্রুত শান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। অক্টোবরের শেষে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। বাস্তব পরিবর্তনের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এলে চাপ কমতে পারে; নতুন সহিংসতা বা অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আন্দোলন আরও কয়েক সপ্তাহ টেনে নিতে পারে। শিক্ষক নিয়োগ ও ভবন সংস্কারের মতো সমস্যার সমাধান অবশ্য দীর্ঘ সময়ের কাজ।
এর বৈশ্বিক প্রভাবও দুটি পথে দৃশ্যমান। ফ্রান্সের বৃহত্তর রাজনৈতিক ও বাজেটসংকটের মধ্যে ঋণবাজারের অস্থিরতা ইউরোজোনে ছড়াচ্ছে; ইউরোর দরেও চাপ পড়েছে। বিক্ষোভ সরকারের বাজেট ও সংস্কার বাস্তবায়নকে আরও কঠিন করতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পপন্থিরা ফরাসি বিক্ষোভকে অভিবাসনবিরোধী প্রচারে ব্যবহার করছেন। শিক্ষার্থীদের বাস্তব দাবি ধর্মীয় সংঘাতের ভাষায় উপস্থাপিত হলে মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬