Loading...

সম্মাননার সঙ্গে প্রয়োজন আর্থিক নিরাপত্তা
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এসব সমস্যার প্রভাব পড়ছে পাঠদানে। ফলে এবারের শিক্ষক দিবসে সম্মাননার পাশাপাশি সামনে এসেছে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, ন্যায্য বেতন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।


শিক্ষকদের অবদান ও মর্যাদার স্বীকৃতি দিতে নানা আয়োজনে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বাংলাদেশেও গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতায় রয়ে গেছে শিক্ষকসংকট, নিয়োগে বিলম্ব এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এসব সমস্যার প্রভাব পড়ছে পাঠদানে। ফলে এবারের শিক্ষক দিবসে সম্মাননার পাশাপাশি সামনে এসেছে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, ন্যায্য বেতন এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
নওগাঁর রানীনগরের ভাটকৈ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১১১ শিক্ষার্থীর জন্য শিক্ষক আছেন দুজন। তাদের একজনের বদলির আদেশ হয়েছে। আদেশ কার্যকর হলে দুই শিফটের বিদ্যালয়টির পাঠদানের দায়িত্ব পড়বে একজনের ওপর। প্রধান শিক্ষকও নেই। গণমাধ্যমে উঠে আসা এই বিদ্যালয়ের চিত্র দেশের শিক্ষকসংকটের একটি উদাহরণ। বিভিন্ন স্তরের শূন্যপদের হিসাব বলছে, সমস্যাটি শুধু একটি বিদ্যালয়ে সীমিত নয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সোমবার (৫ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সরকার প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ১০১ শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রত্যেককে দেওয়া হবে দুই লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগের বছরের ১২ জনের তুলনায় এবার স্বীকৃতির পরিসর বেড়েছে। পাশাপাশি সামনে এসেছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক নিশ্চিত করার প্রশ্ন।
এবারের দিবস শিক্ষকদের মর্যাদা বিষয়ে ১৯৬৬ সালের আইএলও–ইউনেস্কো সুপারিশের ৬০ বছর পূর্তি চিহ্নিত করছে। ইউনেস্কোর প্রতিপাদ্যে পেশার সুরক্ষা, মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ গঠনের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ ও শিক্ষকের অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া এই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতার ব্যবধান উঠে আসছে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ব্যানবেইসের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ তিন লাখ ৮৩ হাজার; শূন্য ৪০ হাজারের বেশি। প্রায় ৩৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদও খালি। দুই ধরনের পদ মিলিয়ে প্রায় ৭৮ হাজার পদ শূন্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মামলার জটিলতায় অনেক বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে।
সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষকের অসম বণ্টন। সহকারী শিক্ষকদের একটি অংশ শহর ও আশপাশের এলাকায় সংযুক্ত থাকায় চর ও দুর্গম অঞ্চলে ঘাটতি বেশি। ফলে জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষকসংখ্যা দিয়ে প্রতিটি বিদ্যালয়ের বাস্তবতা বোঝা যায় না। একই প্রতিষ্ঠানে পাঠদান ও প্রশাসনিক কাজ সামলানোর চাপও বাড়ছে।
সরকারি মাধ্যমিকেও একই ধরনের সমস্যা। মাউশির তথ্য অনুযায়ী, ৬৯৩ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশে। সহকারী শিক্ষকের ১৫ হাজার ২৯৩ অনুমোদিত পদের মধ্যে তিন হাজারের বেশি খালি। বিজ্ঞান, গণিত এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে সংকট বেশি। এসব বিষয়ে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ক্লাস চালানোর কথা এসেছে প্রতিবেদনে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিতে শিক্ষার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; বেশি ভুগছে গ্রাম ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। তার মতে, দ্রুত শূন্যপদ পূরণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ জরুরি।
প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ খালি থাকলে শুধু ক্লাসের সমস্যা হয় না; প্রশাসনিক দায়িত্বও অন্য শিক্ষকদের নিতে হয়। প্রতিবেদনে পাঠদানের পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কথা এসেছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ঘোষণা আর সুপারিশের মধ্যেও বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। সর্বশেষ সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ২০৮ শিক্ষক ও প্রভাষক পদে নিয়োগের কথা থাকলেও সুপারিশ পেয়েছেন ১১ হাজার ৭১৩ জন। ঘোষিত পদের তুলনায় এটি প্রায় ১৭ শতাংশ।
এনটিআরসিএ কর্মকর্তারা গণমামধ্যমকে জানিয়েছেন, শূন্যপদের চাহিদা যাচাইয়ের পর ৬৯ হাজার ৫৭৭ পদে নিয়োগের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তবে বিজ্ঞপ্তির পদ, সুপারিশ এবং বর্তমান শূন্যপদ আলাদা হিসাব; এগুলো যোগ করে সংকটের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

সরকারি কলেজেও শূন্যপদ তিন হাজার ৭৫৪টি। নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ হওয়া এবং কর্মস্থলে শিক্ষক পৌঁছানোর মধ্যবর্তী বিলম্বের উদাহরণ এসেছে ৪৯তম বিসিএসে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ৬৬৭ জনকে চূড়ান্ত সুপারিশের পর পুলিশ যাচাইয়ের কারণে প্রায় ১০ মাস গেজেট আটকে ছিল। সম্প্রতি গেজেট হলেও যোগদান নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিব মাসুদ রানা খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, সংকটের প্রথম আঘাত পড়ে গ্রামের কলেজে। সেখানে যেতে শিক্ষকদের অনাগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালার বাস্তবায়ন না হওয়াকে তিনি সমস্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ নিয়োগের পাশাপাশি কর্মস্থলে শিক্ষক ধরে রাখার বিষয়টিও সামনে আসছে।
কারিগরি খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ হাজার ৮৪৪ অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত সাত হাজার ৭৪ জনের কথা বলা হয়েছে। এই হিসাবে শূন্যপদ ৮ হাজার ৭৭০টি, প্রায় ৫৫ দশমিক ৪ শতাংশ। দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ফরিদা ইয়াসমিন জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক নিয়োগ শূন্যপদের তুলনায় অপ্রতুল; আরও নিয়োগপ্রক্রিয়া চলছে।
শিক্ষকসংকটের ব্যাখ্যায় পেশার আর্থিক আকর্ষণও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন শিক্ষক সংগঠনের নেতারা। বাংলাদেশ শিক্ষক ফোরামের সভাপতি হাবিবুল্লাহ রাজু গণমাধ্যমে জানান, আর্থিক সুবিধা ও শিক্ষার পরিবেশের সমস্যায় মেধাবীরা শিক্ষকতা থেকে সরে যাচ্ছেন।
এছাড়াও মর্যাদার প্রশ্নে ন্যায্য বেতন, নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা, প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছ পদোন্নতির বিষয়গুলোও উঠে আসে। শিক্ষকের জবাবদিহি প্রয়োজন, কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে তদন্ত ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থায়।
সরকারের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনে কাজ করার আশ্বাস এসেছে। শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক এবং মাউশির মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
সম্মাননার আয়োজনের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন বিদ্যালয়ভিত্তিক শূন্যপদের হালনাগাদ ও নিয়মিত প্রকাশিত দাপ্তরিক হিসাব, বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ এবং দুর্গম এলাকায় শিক্ষক ধরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা। প্রকাশিত তথ্য ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্যে সেই প্রয়োজনই সামনে এসেছে। ভাটকৈয়ের মতো বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষক বাস্তবে ক্লাস নিচ্ছেন, সেই পরিবর্তন দিয়েই সংকট নিরসনের অগ্রগতি বোঝা যাবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬