Loading...

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র: আকাশপথে চাপের লড়াই
যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন দেশটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ঘিরেও চলছে। ওয়াশিংটন চাইছে, বিদেশি বিমানবন্দর ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি উড়োজাহাজকে জ্বালানি, অবতরণসেবা বা টিকিট বিক্রির সুযোগ না দিক।


যুদ্ধের পাশাপাশি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত এখন দেশটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ঘিরেও চলছে। ওয়াশিংটন চাইছে, বিদেশি বিমানবন্দর ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ইরানি উড়োজাহাজকে জ্বালানি, অবতরণসেবা বা টিকিট বিক্রির সুযোগ না দিক। তেহরানের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞার পরও তাদের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ হয়নি। দুই পক্ষের দাবির মাঝখানে ফ্লাইটের তথ্য বলছে, উড়োজাহাজ চলছে। তবে আগের তুলনায় অনেক কম।
ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য পর্যালোচনা করে এএফপি জানিয়েছে, রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) তেহরানের ইমাম খোমেনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মোট ৪১টি ফ্লাইট উড্ডয়ন বা অবতরণ করেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের আগের দুই দিনে দৈনিক সংখ্যা ছিল ৮০ থেকে ৯০। রবিবারের ২৪টি ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটের মধ্যে মাহান এয়ারের ছিল পাঁচটি, ইরান এয়ারের দুটি। আগে সংস্থা দুটি প্রতিদিন প্রায় ১০টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করত। তবে মাত্র কয়েক দিনের তুলনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না।
এর বিপরীতে বিমানবন্দরের পরিচালককে উদ্ধৃত করে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, তেহরান থেকে এখনো ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে সেবা চালু আছে। এদিকে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন ৮০–৯০ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ৮ সেপ্টেম্বর ইরানের আরও ২৭টি বিমান সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। মার্কিন সরকারের অভিযোগ, ইরানের বিমান খাতের কিছু অংশ অস্ত্র, জনবল ও নিষিদ্ধ পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সতর্ক করা হয়। নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সংস্থাকে সেবা দিলে তাদের মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে চাপটি কেবল ইরানি বিমান সংস্থার ওপর নয়; তারা বিদেশে যে বিমানবন্দর, জ্বালানি সরবরাহকারী ও সেবাদাতার ওপর নির্ভর করে, তাদের ওপরও।

এই কৌশলের ফল দেশভেদে আলাদা। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনবিহীন একতরফা পদক্ষেপ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। চীনের সঙ্গে মাহান এয়ারের ফ্লাইটও চলেছে। রাশিয়া ও পাকিস্তানগামী ফ্লাইট চালুর খবর রয়েছে।
অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানি বিমান সংস্থার ফ্লাইট স্থগিত করেছে। তুরস্কের অবস্থানও একরকম নয়। মাহান এয়ার দেশটিতে ফ্লাইট বন্ধ করলেও ইরান এয়ার ইস্তাম্বুলে চলাচল অব্যাহত রেখেছে। তাই কোনো দেশে ফ্লাইট চললেই পুরো দেশ ‘নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করছে’ বলাও সরলীকরণ হবে।
এদিকে ইরাক চিকিৎসা, পড়াশোনা ও ধর্মীয় সফরের যাত্রীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ছাড় চেয়েছে। সোমবার ইরাকি এয়ারওয়েজ নাজাফ ও ইরানের বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে ফ্লাইট আবার চালুর কথা জানায়। কিন্তু ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর ইরাকে নিষেধাজ্ঞা তখনো বহাল ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম শাফাক নিউজকে একটি সূত্র জানিয়েছে। রয়টার্সের একটি সূত্র বলেছে, ইরাকি এয়ারওয়েজের জন্য এক মাসের সীমিত মার্কিন ছাড় দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল। তবে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় তখন তা নিশ্চিত করেনি।
তেহরান কূটনৈতিক পথেও নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করছে। ইরানের বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার প্রধানের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটি মার্কিন বিধিনিষেধ নিয়ে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থায় অভিযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অভিযোগের যে দাবি এসেছে, ইরানি কর্মকর্তার ব্যাখ্যায় সেটি বিমানবন্দর, উড়োজাহাজ ও রাডারে হামলা সংক্রান্ত। দুটি বিষয়কে একই মামলা হিসেবে তুলে ধরা ঠিক হবে না।
বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাবটি স্পষ্ট। সাত মাসের যুদ্ধের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের যোগাযোগ ও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। আর ইরান দেখাতে চাইছে তাকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। একই সময়ে দুই দেশ মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথকভাবে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেছে। বিমান চলাচলের বিধিনিষেধ তাই আলোচনায় চাপ তৈরির একটি উপায় হয়ে উঠতে পারে।
এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করতে পারেনি। আবার তেহরানের ‘৩০ গন্তব্য’ চলাচলের দাবিও প্ররিপূর্ণ সত্য নয়। পরের কয়েক সপ্তাহে ফ্লাইটের সংখ্যা, কোন রুট টিকে থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র তৃতীয় দেশের সেবাদাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় কি না—সেখানেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা বোঝা যাবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬