Loading...

প্রতিবছর বিষক্রিয়ার শিকার আনুমানিক ৪ লাখ
বাংলাদেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমের বড় অংশ ভারতীয় উৎসের। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় বাংলাদেশের রাসেলস ভাইপারের বিষের বিরুদ্ধে ভারতীয় ভিআইএনএস পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনমের সীমিত কার্যকারিতা পাওয়া গেছে।


হাসপাতালে ওষুধ পৌঁছেছে, কিন্তু রোগী পৌঁছাচ্ছেন দেরিতে। কোথাও অ্যান্টিভেনম থাকলেও তা সময়মতো দেওয়া হচ্ছে না, কোথাও মজুত শেষ, আবার গুরুতর রোগীর জন্য শ্বাস-সহায়তা ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থাও সীমিত।
বর্ষা এলেই দেশে সাপে কাটার ঘটনা বাড়ে। এ কারণে চলতি বছরের জুলাইয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, দেশের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনমের পর্যাপ্ত মজুত করা হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রীও বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম আছে। তাঁর ভাষ্য, মূল সমস্যা হচ্ছে অনেক রোগী হাসপাতালে পৌঁছান দেরিতে, তখন তাঁদের অবস্থা গুরুতর হয়ে যায়।
কিন্তু মাঠের কয়েকটি ঘটনা বলছে, শুধু হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম পৌঁছে দিলেই সাপে কাটা মৃত্যুর ঝুঁকি কমে না। গত ১০ মে দিনাজপুরে জুলেখা খাতুন নামে ৫৫ বছরের এক নারীকে সাপে কাটার পর দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অ্যান্টিভেনম মজুত ছিল। সাপটিকেও ধরে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তারপরও তাঁকে অ্যান্টিভেনম না দিয়ে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেও তাঁকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়নি এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়।
আবার জুলাইয়ে জামালপুরে রিনা আক্তারের ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল সরবরাহে। সাপে কাটার পর তাঁকে জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে অ্যান্টিভেনম না থাকায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পথে তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ এক জায়গায় ওষুধ ছিল, কিন্তু ব্যবহার হয়নি; আরেক জায়গায় প্রয়োজনের সময় ওষুধই ছিল না।
সমস্যার বড় অংশ হাসপাতালের বাইরেও। বাংলাদেশ সরকারের ২০২৬ সালের National Snakebite Strategy and Costed Plan of Action-এ বলা হয়েছে, দেশে বছরে আনুমানিক ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ সাপের বিষক্রিয়ার শিকার হন এবং ৭ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। একই কৌশলপত্রে হাসপাতালে দেরিতে পৌঁছানো, ওঝার কাছে চিকিৎসা নেওয়া, ভুল প্রাথমিক চিকিৎসা, প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি এবং উপজেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে সাপে কাটার পর এখনো ওঝার কাছে যাওয়ার প্রবণতা কতটা বেশি, তার প্রমাণ পুরোনো হলেও গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতীয় পর্যায়ের গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ বাংলাদেশে সাপে কাটা রোগীদের মাত্র ৩ শতাংশ সরাসরি চিকিৎসক বা হাসপাতালে গিয়েছিলেন; বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রথমে প্রচলিত চিকিৎসা বা ওঝার শরণ নিয়েছিলেন। একই গবেষণায় বছরে প্রায় ৫ লাখ ৯০ হাজার মানুষকে সাপে কাটার এবং প্রায় ৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছিল। এই হিসাব পুরোনো; তাই বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি পরিমাপ হিসেবে নয়, দীর্ঘদিনের চিকিৎসা-অনুসন্ধান আচরণের প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা দরকার।
সময় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভুল প্রাথমিক চিকিৎসাও বিপদ বাড়ায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কৌশলপত্রে শক্ত করে বাঁধা, অকার্যকর স্থানীয় চিকিৎসা এবং ঝাড়ফুঁকের মতো পদ্ধতি এড়িয়ে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই পরিকল্পনায় উপজেলা পর্যায়েই অ্যান্টিভেনম দেওয়ার পাশাপাশি রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস, রক্তচাপ, শক এবং অ্যান্টিভেনমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানোর সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
কারণ অ্যান্টিভেনম সব ধরনের বিষক্রিয়ার একমাত্র চিকিৎসা নয়। গোখরা বা কালাচের মতো নিউরোটক্সিক সাপের বিষে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। তখন অ্যান্টিভেনমের পাশাপাশি অক্সিজেন, অ্যাম্বু ব্যাগ, শ্বাসনালি ব্যবস্থাপনা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস প্রয়োজন হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালায় এসব সরঞ্জাম ও দক্ষতাকে সাপে কাটা রোগীর জরুরি চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ হিসেবে ধরা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যও দেখায়, গুরুতর বিষক্রিয়ার রোগী কত দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে ১ হাজার ২০৩ জন সাপে কাটা রোগী ভর্তি হন। তাঁদের মধ্যে ২৫৯ জন বিষধর সাপে আক্রান্ত ছিলেন এবং মোট ৪১ জনের মৃত্যু হয়। শুধু রাসেলস ভাইপারের কামড়েই মারা যান ১২ জন। একই সময়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ-সংকটের কথাও জানিয়েছিল। অন্যদিকে রাজশাহী সিভিল সার্জন দাবি করেছিলেন, জেলার সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করা হয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও নজরে রাখার মতো। বাংলাদেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমের বড় অংশ ভারতীয় উৎসের। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণায় বাংলাদেশের রাসেলস ভাইপারের বিষের বিরুদ্ধে ভারতীয় ভিআইএনএস পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনমের সীমিত কার্যকারিতা পাওয়া গেছে। তবে এটি প্রাণীভিত্তিক ও পরীক্ষাগার গবেষণা; মানুষের চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে একে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে নেওয়া যায় না। গবেষকেরা বরং স্থানীয় সাপের বিষের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
সব তথ্য একসঙ্গে রাখলে বাংলাদেশের সাপে কাটা মৃত্যুর সমস্যাটি পরিষ্কার হয়। এটি শুধু অ্যান্টিভেনমের ঘাটতির সমস্যা নয়। কামড়ের পর রোগী কোথায় গেলেন, কতক্ষণ পর হাসপাতালে পৌঁছালেন, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম ছিল কি না, থাকলে দ্রুত প্রয়োগ হলো কি না, রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হলে তা সামলানোর ব্যবস্থা ছিল কি না এবং গুরুতর হলে দ্রুত উচ্চতর হাসপাতালে নেওয়া গেল কি না—প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নতুন কৌশলপত্রেও তাই শুধু অ্যান্টিভেনম সরবরাহ নয়; দ্রুত পরিবহন, উন্নত রেফারেল ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স, উপজেলা পর্যায়ে জরুরি চিকিৎসা এবং জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ অ্যান্টিভেনম এখন অনেক জায়গায় আছে। কিন্তু সাপে কাটা মানুষের জীবন বাঁচাতে দরকার অ্যান্টিভেনমের চেয়েও বড় একটি চিকিৎসা-শৃঙ্খল। সেই শৃঙ্খলের কোথাও দেরি হলে বা কোনো একটি ধাপ কাজ না করলে হাসপাতালের তাকের ওষুধও মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে না।
নবোদয়/ আরআই/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬