Loading...

মানসিক স্বাস্থ্য
সংসারের খরচ, চাকরি কিংবা সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু একই আশঙ্কা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকলে ঘুম, কাজ ও মনোযোগে প্রভাব পড়তে পারে। এই চাপ সামলানোর কিছু উপায় নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা। কয়েকটি গবেষণায় চিন্তা লিখে রাখা ও কাজের ফাঁকে ছোট বিরতির সুফল মিলেছে। নিজের অনুভূতি স্বীকার করার সঙ্গেও ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।


সংসারের খরচ, চাকরি কিংবা সম্পর্ক নিয়ে দুশ্চিন্তা জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু একই আশঙ্কা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকলে ঘুম, কাজ ও মনোযোগে প্রভাব পড়তে পারে। এই চাপ সামলানোর কিছু উপায় নিয়ে কাজ করছেন গবেষকেরা। কয়েকটি গবেষণায় চিন্তা লিখে রাখা ও কাজের ফাঁকে ছোট বিরতির সুফল মিলেছে। নিজের অনুভূতি স্বীকার করার সঙ্গেও ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লুকাস লাফ্রেনিয়ের ও মিশেল নিউম্যানের একটি গবেষণায় দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত ২৯ জন অংশ নেন। তারা ১০ দিন নিজেদের দুশ্চিন্তা লিখে রাখেন এবং ৩০ দিন ধরে সেগুলোর পরিণতি পর্যবেক্ষণ করেন। দেখা যায়, নথিভুক্ত আশঙ্কাগুলোর ৯১ দশমিক ৪ শতাংশই বাস্তবে ঘটেনি। গবেষণাটি ২০২০ সালে বিহেভিয়ার থেরাপি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।
যাদের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হওয়ার হার বেশি ছিল, চিকিৎসার সময় তাদের উদ্বেগের উপসর্গ কমার প্রবণতাও বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, বাস্তব তথ্য দিয়ে আশঙ্কা যাচাই করা চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে। তবে গবেষণাটি ছোট এবং নির্দিষ্ট সমস্যায় থাকা মানুষদের নিয়ে করা।
দুশ্চিন্তা সামলাতে ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএস প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ মিনিট আলাদা রাখার পরামর্শ দেয়। এই সময়ে চিন্তাগুলো লিখে দেখতে হবে, কোন সমস্যায় এখন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, কোনটিতে পরে ব্যবস্থা নিতে হবে, আর কোনটি নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দিনের অন্য সময়ে একই চিন্তা ফিরে এলে নির্ধারিত সময়ে সেটি বিবেচনার কথা নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়া যায়।
এই ধারণার সঙ্গে মিল আছে আলোচিত ‘৬:৩০ নিয়মের’। এতে সন্ধ্যার পর দুশ্চিন্তার জন্য একটি সীমা রাখার কথা বলা হয়। মার্কিন মনোবিদ এলি ক্রেইম রিয়্যাল সিম্পলকে বলেন, প্রতিটি উদ্বেগের চিন্তায় সঙ্গে সঙ্গে মনোযোগ দিতে হয় না, মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে সেটি শেখানো যায়। তবে সাড়ে ছয়টা সবার জন্য বাধ্যতামূলক সময় নয়। কাজ ও ঘুমের সময় অনুযায়ী সীমা বেছে নেওয়া যায়।

পরদিন সহকর্মীকে ফোন করতে হবে, এই ভাবনা বারবার এলে কখন ফোন করবেন তা লিখে রাখা যেতে পারে। সম্পর্কের কোনো সমস্যা থাকলে শান্তভাবে কথা বলার সময় ঠিক করা যায়। এতে সমস্যা সমাধানের জন্য একটি পরিকল্পনা থাকে। এনএইচএসের পরামর্শও হলো, বাস্তবে কিছু করার সুযোগ থাকলে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ ঠিক করা এবং সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা।
ঘুমের আগে লিখে রাখার সুফল পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের বেইলর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পরীক্ষাতেও। ২০১৮ সালে প্রকাশিত গবেষণায় ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি ৫৭ জন সুস্থ তরুণ অংশ নেন। তাদের দুই দলে ভাগ করা হয়। এক দল পাঁচ মিনিট ধরে সামনের দিনের কাজ লেখে, অন্য দল লেখে এরই মধ্যে শেষ করা কাজের তালিকা। পরীক্ষাগারে যন্ত্রের সাহায্যে তাদের ঘুম পর্যবেক্ষণ করা হয়।
পরবর্তী কাজের তালিকা লেখা দলটি অন্য দলের তুলনায় গড়ে প্রায় নয় মিনিট আগে ঘুমিয়ে পড়ে। গবেষক মাইকেল স্কালিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবেদনে বলেন, ‘অনেকে করণীয় কাজের তালিকাটি শুধু মাথার মধ্যে ঘুরিয়ে চলেন।’
তার দল দেখতে চেয়েছিল, কাজগুলো লিখে ফেললে ঘুমাতে যাওয়ার সমস্যা কমে কি না। তবে দীর্ঘদিন অনিদ্রায় ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ফল হবে কি না, তা এই পরীক্ষা থেকে জানা যায়নি।
অন্যের আচরণ নিয়ে অস্থিরতা কমাতে মার্কিন লেখক মেল রবিনসের ‘লেট দেম’ ধারণা নিজের করণীয়ে মন দিতে বলে। অন্যকে নিজের প্রত্যাশামতো বদলানোর চেষ্টার পর নিজের সিদ্ধান্তের জায়গাটি চেনাই এর লক্ষ্য। এর সঙ্গে আছে ‘লেট মি’, অর্থাৎ এবার আমি কী করব। তবে রবিনস নিজেই বলেছেন, বিপজ্জনক আচরণ, বৈষম্য বা ব্যক্তিগত সীমা লঙ্ঘন মেনে নেওয়ার জন্য এই কৌশল নয়।
নিজের অনুভূতি গ্রহণের বিষয়ে আলাদা গবেষণাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাসের গবেষকদের তিনটি সমীক্ষা ও পরীক্ষায় মোট এক হাজার তিনশর বেশি প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন। গবেষণাগুলো অনলাইনে প্রশ্নোত্তর, পরীক্ষাগারের চাপের পরিস্থিতি এবং দৈনন্দিন অনুভূতি লিখে রাখার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যারা দুঃখ, হতাশা বা অন্য নেতিবাচক অনুভূতির জন্য নিজেকে দোষারোপ কম করতেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়। একটি অংশে ছয় মাস পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭ সালে এক প্রতিবেদনে ফলাফলগুলো তুলে ধরে।

গবেষক আইরিস মাউস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, ‘যারা নিজের নেতিবাচক অনুভূতিকে নিয়মিত স্বীকার করেন, তাদের নেতিবাচক অনুভূতির অভিজ্ঞতা কম হয়, যা ভালো মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত।’ ফলটি অনুভূতি স্বীকার করা ও মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক দেখায়। এটি মেল রবিনসের কৌশলের সরাসরি পরীক্ষা নয়, কিংবা শুধু অনুভূতি মেনে নিলেই মানসিক সমস্যা সেরে যাবে, এমন প্রমাণও নয়।
কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নিয়েও গবেষণা হয়েছে। রোমানিয়ার গবেষক প্যাট্রিসিয়া আলবুলেস্কু ও তার সহকর্মীরা ১৯টি প্রকাশনার ২২টি স্বতন্ত্র নমুনার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেন। এতে মোট ২ হাজার ৩৩৫ জনের তথ্য ছিল। ২০২২ সালে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ১০ মিনিটের বিরতিতে ক্লান্তি কিছুটা কমে এবং সতেজতা বাড়ে।
তবে সামগ্রিক কর্মদক্ষতা বাড়ার ফল পরিসংখ্যানের বিচারে নিশ্চিত ছিল না। ফলে ছোট বিরতি নিলেই সব ধরনের কাজে ভালো ফল হবে, এমন দাবি করা যায় না। বেশি মানসিক পরিশ্রমের কাজের পর দীর্ঘ বিরতির প্রয়োজন হতে পারে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এসব ফল বলছে, বিরতির মূল্য শুধু বেশি কাজ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ক্লান্তি কমাও একটি গুরুত্বপূর্ণ লাভ।
দৈনন্দিন উদ্বেগ সামলাতে এসব অভ্যাস চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে ফল বুঝতে সময় লাগতে পারে। নিজের জন্য কোনটি কার্যকর হচ্ছে, সেটিও দেখা দরকার। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরামর্শ হলো, উদ্বেগ ঘুম, পড়াশোনা, কাজ বা সম্পর্কের সমস্যা তৈরি করলে পেশাদার সহায়তা নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মনোচিকিৎসা, ওষুধ কিংবা উভয় ব্যবস্থাই লাগতে পারে। ছোট অভ্যাস সহায়ক হলেও চিকিৎসার বিকল্প নয়।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬