Loading...

মাঠে কিশোর, নেপথ্যে ‘বড় ভাই’
চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য মিলছে। কিন্তু সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যতটা দৃশ্যমান, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহি ততটা স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযান কি শুধু লোক দেখানো?


চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাং ও সংঘবদ্ধ অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযানে গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য মিলছে। কিন্তু সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যতটা দৃশ্যমান, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের জবাবদিহি ততটা স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অভিযান কি শুধু লোক দেখানো?
খুলনায় মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত থেকে ৭ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৯৫ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, তাদের বড় অংশ মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত। পুলিশের চলাচলের তথ্য পাচারকারীও রয়েছেন তাদের মধ্যে। পুলিশ সুপার রাজনৈতিক অনুরোধে অপরাধীদের ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এর আগে খুলনার টুটপাড়ায় বিএনপি নেতার বাড়িতে গুলিবর্ষণের মামলায় ২৭ সেপ্টেম্বর আটজন গ্রেপ্তার হন। দৈনিক খুলনাঞ্চলের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, দুই প্রাপ্তবয়স্ককে কারাগারে এবং ছয় কিশোরকে শিশু আদালতের নির্দেশে যশোরের উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ২২ সেপ্টেম্বর গ্যাং পরিচালনার অভিযোগে শ্রাবণসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল ও ছয়টি রামদা উদ্ধার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বয়স ১৯–২০ বছর; অর্থাৎ ‘কিশোর গ্যাং’ নামে চিহ্নিত দলে প্রাপ্তবয়স্কও আছেন।
কুমিল্লায় ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে ১৮ থানার অভিযানে আটক হন ৬২৪ জন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যাচাই শেষে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়; বিভিন্ন অভিযোগে ১৭৩ জনকে আদালতে পাঠানো হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে মাদক, আগের মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ছিল।

চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে ২৭ সেপ্টেম্বরের অভিযানে সন্দেহভাজন ৬০২ জনকে আটক করে পুলিশ। চাঁদপুরের পুলিশ সুপারের ভাষ্য, মাদক পাওয়া গেলে মামলা এবং অন্যদের পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। এখানেও আটকদের পরিচয় ও অপরাধে সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
চট্টগ্রামে সিএমপির ২০২৪ সালের তালিকায় ২০০ গ্যাং, প্রায় ১ হাজার ৪০০ সদস্য এবং পাঁচ ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ কথিত ‘বড় ভাইয়ের’ উল্লেখ রয়েছে।
এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের অভিযোগ আলোচনায় এনেছে চট্টগ্রামের নগর ভবনের ঘটনা। মঙ্গলবার বহিষ্কৃত স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগাকে ধরতে গিয়ে মেয়রের হস্তক্ষেপে পুলিশ ফিরে আসে বলে অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের অভিযোগ, বগা ‘সেভেন স্টার’ পরিচালনায় যুক্ত। মেয়র শাহাদাত হোসেন বগাকে নিজের গাড়িতে পালাতে সাহায্যের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন; বলেছেন, এসেছিলেন বগার দুই ভাই।
কুমিল্লায়ও পৃষ্ঠপোষক বদলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, আগে ছাত্রলীগের আশ্রয়ে থাকা ‘রাও’ ও ‘ক্রাইম সেটআপ’-এর মতো গ্যাং এখন ছাত্রদলের কিছু নেতার প্রশ্রয় পাচ্ছে। অভিযুক্ত এক নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সংগঠনের মহানগর সভাপতি সাংগঠনিক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। তবে সদস্য ও গ্যাংপ্রধানদের গ্রেপ্তার করা হলেও মূল পৃষ্ঠপোষকেরা অধরাই থাকে।
এসব মদদের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। কেএমপির গোয়েন্দা বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বি কোম্পানি, পলাশ ও হুমার মতো বড় অপরাধী বাহিনীগুলো মাঠের কাজে কিশোর দল ব্যবহার করে এবং অস্ত্র সরবরাহ করে। মাদক বিক্রি, চাঁদা আদায় ও এলাকা নিয়ন্ত্রণের এই সম্পর্ক অনুসন্ধান ছাড়া শুধু সদস্য গ্রেপ্তারে মূল কাঠামো অক্ষত থাকার ঝুঁকি থাকে।

উত্থানের ব্যাখ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বাংলা গণমাধ্যমকে বলেছেন, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক প্রক্রিয়ায় কিশোরদের অপরাধে টানা হয়। সহজ আয়, এলাকায় পরিচিতি এবং প্রভাবশালীদের সান্নিধ্য অপরাধকে আকর্ষণীয় করে। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দুর্বল নজরদারি এবং পুনর্বাসনের ঘাটতিও আলোচনায় এসেছে। কেবল ‘বখে যাওয়া’ বলে এই যোগাযোগ ব্যাখ্যা করা যায় না।
গ্রেপ্তারের পর শিশুদের জন্য আলাদা আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, বয়স যাচাই, অভিভাবক ও প্রবেশন কর্মকর্তাকে জানানো এবং নিরাপদ হেফাজত নিশ্চিত করতে হয়। থানা থেকে জামিন না হলে প্রয়োজনীয় যাত্রার সময় বাদ দিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শিশু আদালতে হাজির করার বিধান রয়েছে। আদালত জামিন অথবা নিরাপদ স্থান বা উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখার আদেশ দিতে পারেন।
আইনে প্রবেশন কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচর্যা, শিক্ষা ও তত্ত্বাবধান পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও রয়েছে। কিন্তু আলোচিত অভিযানের সংবাদে মুক্তি পাওয়া কিশোরদের পরবর্তী নজরদারি, পড়াশোনায় ফেরা বা পুনরায় অপরাধে জড়ানোর তুলনাযোগ্য হিসাব পাওয়া যায় না। পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগপত্র বা বিচারের নজীর নাই বললেই চলে।
অভিযানের পাশাপাশি প্রতিরোধে উদ্যোগও প্রস্তাব করছে সরকার। সম্প্রতি মাউশি ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকার প্রকল্পের সারসংক্ষেপ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। প্রথম ধাপে ৩৯১ সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গেম, কুইজ, সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে; প্রস্তাবিত মেয়াদ ২০২৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। তবে স্কুলের বাইরে থাকা কিশোরদের কাছে প্রতিরোধ পৌঁছাবে কীভাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
একাধিক এলাকার ঘটনা সংগঠিত অপরাধে কম বয়সিদের ব্যবহারের ধারাবাহিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তবে দেশজুড়ে গ্যাং কতটা বেড়েছে, তা বলার মতো তুলনাযোগ্য হালনাগাদ তথ্য নেই। অভিযানের ফল শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যায় বিচার করলে অসম্পূর্ণ থাকবে। অর্থ ও অস্ত্রের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধে প্রমাণভিত্তিক ব্যবস্থা, মামলার অগ্রগতি এবং শিশুদের সমাজে ফেরানো গুরুত্বপূর্ণ।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬