Loading...

অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গেই বাড়ছে ভূরাজনৈতিক চাপ
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামরিক সংঘাতের এই দুই সম্ভাবনা আসলে একই কারণে তৈরি হয়েছে—বঙ্গোপসাগরের ভূগোল। এটি ভারত মহাসাগরকে মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি, আফ্রিকার কাঁচামাল এবং ইউরোপ-এশিয়ার বিপুল পণ্য এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।


ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ থেকে বঙ্গোপসাগর নিয়ে বিপরীতমুখী দুটি বার্তা এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অঞ্চলটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে বন্দর, নৌপথ, জ্বালানি, মৎস্য, পর্যটন ও আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর সতর্ক করেছেন, তাইওয়ান ঘিরে উত্তেজনা বাড়লে মালাক্কা প্রণালি হয়ে বঙ্গোপসাগর পরাশক্তির সংঘাতের পরবর্তী ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সামরিক সংঘাতের এই দুই সম্ভাবনা আসলে একই কারণে তৈরি হয়েছে—বঙ্গোপসাগরের ভূগোল। এটি ভারত মহাসাগরকে মালাক্কা প্রণালি ও দক্ষিণ চীন সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি, আফ্রিকার কাঁচামাল এবং ইউরোপ-এশিয়ার বিপুল পণ্য এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের প্রায় ৯৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিচালিত হয়। ভারতের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৭০ শতাংশের বেশি এই সাগরনির্ভর। ফলে এই জলপথে সামান্য অস্থিরতাও জ্বালানির মূল্য, পণ্য পরিবহন, জাহাজের বিমা ব্যয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দিতে পারে।
মালাক্কা প্রণালি ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত নৌপথগুলোর একটি। পথটি সংকীর্ণ হওয়ায় কোনো সামরিক সংঘাত, অবরোধ কিংবা বড় দুর্ঘটনায় জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা সরাসরি সংঘাতে রূপ নিলে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কৌশলগত অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। তার প্রভাব মালাক্কার পশ্চিমে আন্দামান সাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।
চীনের জন্য এই পথ বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জীবনরেখা। তাই বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ও মেরিটাইম সিল্ক রোডের আওতায় বেইজিং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বন্দর, সড়ক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করছে। চীনের লক্ষ্য বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি একক সামুদ্রিক পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো।
ভারত বঙ্গোপসাগরকে নিজেদের নিরাপত্তাবলয় হিসেবে দেখে। মালাক্কার কাছে গ্রেট নিকোবর দ্বীপে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও নগর অবকাঠামো নির্মাণ করছে নয়াদিল্লি। ভারত সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির লক্ষ্য দেশটির সামুদ্রিক ও অর্থনৈতিক উপস্থিতি শক্তিশালী করা এবং বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমানো। প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম নৌপথ থেকে প্রায় ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত।

যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে অবাধ নৌচলাচল বজায় রাখা এবং চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষের বসবাস এই বিস্তৃত অঞ্চলে; এখানকার সামুদ্রিক পথ দিয়ে বৈশ্বিক কনটেইনার পণ্য ও জ্বালানির বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ফলে বঙ্গোপসাগর ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা—দুই কৌশলেই গুরুত্বপূর্ণ।
জাপান সামরিক প্রতিযোগিতার বদলে অবকাঠামো ও যোগাযোগে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিগ-বি উদ্যোগের আওতায় কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে অর্থায়ন করছে দেশটি। জাইকার মতে, বন্দরটির লক্ষ্য বাংলাদেশের পণ্য পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ সহজ করা।
বঙ্গোপসাগরে সংঘাত শুরু হলেই যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাগুলি চলবে—বিষয়টি এত সরল নয়। সংঘাত শুরু হতে পারে বন্দর ব্যবহারের অনুমতি, সামরিক উড়োজাহাজের চলাচল, সাবমেরিনের উপস্থিতি, গোয়েন্দা নজরদারি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে যোগ দেওয়ার চাপ দিয়ে। মিয়ানমারের রাখাইন সংঘাত ও রোহিঙ্গা সংকট ইতোমধ্যে দেখিয়েছে, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা কীভাবে পুরো বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি কোথায়
বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থান, চট্টগ্রাম-মোংলা-মাতারবাড়ী বন্দর, বিশাল বাজার, সমুদ্রসীমা এবং ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগ—এসবই বাংলাদেশের ‘বার্গেনিং চিপ’। কিন্তু শুধু ভৌগোলিক অবস্থান থাকলেই দরকষাকষির শক্তি তৈরি হয় না। প্রয়োজন কার্যকর বন্দর, দক্ষ কূটনীতি, বিনিয়োগের স্বচ্ছ শর্ত, সমুদ্র নজরদারির সক্ষমতা এবং কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করার নীতি।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সবার সঙ্গে কাজ করা, কিন্তু কারও সংঘাতে ব্যবহৃত না হওয়া। ভারসাম্যের কূটনীতি ব্যর্থ হলে বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বই বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করবে। আর সফল হলে একই ভূগোল বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সুনীল অর্থনীতির মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬