Loading...

ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ধাক্কা এক নয়
দুর্যোগ মানুষের জীবনকে শুধু বাইরে থেকে বদলায় না, পরিবারের ভেতরের সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে। একটি এলাকায় ঝড় মানুষকে ভবিষ্যতের খরচ ও অনিশ্চয়তার কথা ভাবিয়ে সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে পারে। অন্য এলাকায় বারবার বন্যার সঙ্গে বসবাসকারী একটি পরিবার সন্তানকে ভবিষ্যতের সহায়তা হিসেবে ভাবতে পারে।


বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় বা বন্যা হলে আমরা সাধারণত হিসাব করি কত বাড়ি ভেঙেছে। কত জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। কত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে গেছে। কিন্তু দুর্যোগের প্রভাব যে একটি পরিবারের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বদলে দিতে পারে, সে কথা খুব কমই আলোচনায় আসে। বাংলাদেশের দুটি দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ওপর করা নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগের প্রভাব সব জায়গায় এক রকম নয়।
ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বড় দুর্যোগের সঙ্গে কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। আবার বন্যাপ্রবণ এলাকায় বারবার বন্যার সঙ্গে বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ একই দেশের দুই এলাকায় দুর্যোগ এলেও পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে একইভাবে সিদ্ধান্ত নেয় না।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ Journal of Biosocial Science-এ। গবেষকেরা সাতক্ষীরার শ্যামনগরের চাদনিমুখা এবং সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের লামাগাঁও গ্রামের মানুষকে নিয়ে কাজ করেছেন। জরিপে অংশ নিয়েছেন ৫৪৪ জন বিবাহিত নারী। তাঁদের পাশাপাশি নারী-পুরুষের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়েছে, যাতে বোঝা যায় দুর্যোগের পরে পরিবারের সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে বদলায়।
তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—গবেষণার মাঠতথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল ২০১৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে। তাই এটি ২০২৬ সালের বাংলাদেশের মোট জন্মহার কমছে না বাড়ছে, তার হিসাব নয়। বরং নির্দিষ্ট দুই এলাকার মানুষের অভিজ্ঞতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তুলে ধরেছে।

সাতক্ষীরার চাদনিমুখার পরিবারগুলোর জীবনে ঘূর্ণিঝড়ের ধাক্কা অনেক বেশি সরাসরি। বড় ঝড় এলে ঘরবাড়ি নষ্ট হয়। কাজ বন্ধ হয়ে যায়। আয়ের পথ বন্ধ হয়। কখনো স্বামীকে কাজের জন্য অন্য জায়গায় চলে যেতে হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই এলাকার ৩১ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, কোনো বড় দুর্যোগের পরে তাঁদের স্বামী অন্যত্র চলে গেছেন। লামাগাঁওয়ে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ঘূর্ণিঝড়ের পরে শুধু ঘর নয়, একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপনও ভেঙে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সন্তান নেওয়া অনেক পরিবারের কাছে বাড়তি দায়িত্ব বলে মনে হতে পারে। আয় কমে গেলে, বসতবাড়ি আবার গড়ে তুলতে হলে কিংবা স্বামী দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বদলে যায়। গবেষণার তথ্যেও তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। চাদনিমুখায় একজন নারীর জীবনে জন্ম নেওয়া সন্তানের গড় সংখ্যা ছিল ২ দশমিক ০৬। অর্থাৎ সেখানে পরিবারগুলো তুলনামূলক ছোট।
কিন্তু সুনামগঞ্জের লামাগাঁওয়ে গল্পটা আলাদা। সেখানে মানুষের জীবন অনেক বেশি নদী, বিল ও বন্যার সঙ্গে জড়িত। কৃষিকাজ ও মাছ ধরা বহু পরিবারের প্রধান জীবিকা। বারবার বন্যার সঙ্গে বসবাস করতে করতে কিছু পরিবারের কাছে সন্তান শুধু পরিবারের সদস্য নয়, ভবিষ্যতে বিপদের সময় পাশে থাকার একজন সহায়তাও।
ঘর মেরামত, মাছ ধরা, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস আনা কিংবা দুর্যোগের পরে সংসার আবার দাঁড় করানোর কাজে সন্তানদের ভূমিকা থাকবে এমন ধারণা গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা পরিবারগুলোর মধ্যে পাওয়া গেছে। লামাগাঁওয়ে একজন নারীর জীবনে জন্ম নেওয়া সন্তানের গড় সংখ্যা ছিল ৩ দশমিক ৭৫।
এই পার্থক্যের সঙ্গে ছেলে সন্তানের প্রতি পরিবারের পছন্দেরও সম্পর্ক আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, লামাগাঁওয়ের ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা দ্বিতীয় সন্তানের ক্ষেত্রে ছেলে সন্তান পছন্দের কথা বলেছেন। কারণ হিসেবে দুর্যোগের সময় ছেলেরা পরিবারের শারীরিক ও অর্থনৈতিক কাজে বেশি সহায়তা করতে পারবে এমন ধারণা উঠে এসেছে। তবে এর মানে এই নয় যে শুধু ছেলে সন্তান চাওয়ার কারণেই পরিবারগুলো বেশি সন্তান নেয়। জীবিকা, পারিবারিক প্রয়োজন, সামাজিক ধারণা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সবকিছু মিলিয়েই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জন্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ। দুর্যোগের সময় পরিবার পরিকল্পনা শুধু ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার সুযোগও থাকতে হয়। গবেষণায় দুই এলাকার প্রায় এক-চতুর্থাংশ নারী জানিয়েছেন, বড় দুর্যোগের সময় অন্তত একবার তাঁরা গর্ভনিরোধক সংগ্রহ করতে পারেননি। চাদনিমুখায় এ হার ছিল ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ, লামাগাঁওয়ে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ কেউ সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে চাইলেও ঝড় বা বন্যার সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া, ওষুধ পাওয়া কিংবা নিয়মিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে যেতে পারে।
শিশুর নিরাপত্তা নিয়েও দু’এলাকার মানুষের উদ্বেগ ছিল। বেশির ভাগ উত্তরদাতা মনে করেছেন, বড় দুর্যোগের সময় শিশুদের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, শিশুমৃত্যুর অভিজ্ঞতার কারণে পরিবার নিশ্চিতভাবেই আরও সন্তান নেয় এমন সরাসরি প্রমাণ এই গবেষণায় পাওয়া যায়নি। কিছু সাক্ষাৎকারে এমন ভাবনার কথা উঠে এলেও সংখ্যাগত বিশ্লেষণ থেকে এটিকে সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, দুর্যোগ মানুষের জীবনকে শুধু বাইরে থেকে বদলায় না, পরিবারের ভেতরের সিদ্ধান্তও বদলাতে পারে। একটি এলাকায় ঝড় মানুষকে ভবিষ্যতের খরচ ও অনিশ্চয়তার কথা ভাবিয়ে সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে পারে। অন্য এলাকায় বারবার বন্যার সঙ্গে বসবাসকারী একটি পরিবার সন্তানকে ভবিষ্যতের সহায়তা হিসেবে ভাবতে পারে। কোথাও আবার দুর্যোগের সময় জন্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়াও অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি বলতে শুধু ঘর রক্ষা, আশ্রয়কেন্দ্র বা ত্রাণ বোঝালে ছবির একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। দুর্যোগের সময়ে একটি পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে নারীর পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজননস্বাস্থ্য সেবা সচল রাখা একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি ঝড় থেমে যাওয়ার পর ভাঙা ঘর আবার তৈরি করা যায়, হারানো ফসলও কোনো এক সময় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু দুর্যোগের মধ্যে নেওয়া একটি পারিবারিক সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক বছর ধরে থেকে যেতে পারে।
নবোদয়/ আরআই/ জেডআরসি/ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬