Loading...

একটি পোস্টেই আটকে যেতে পারে চাকরি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে। ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, ই-মেইল, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা ট্রেড লাইসেন্সের ছবি পোস্ট করলে প্রতারণা বা পরিচয় চুরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।


ফেসবুক এখন আর শুধু বিনোদন কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়। আপনার পোস্ট, মন্তব্য, ছবি, শেয়ার ও প্রতিক্রিয়া থেকে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, রুচি, আচরণ, দক্ষতা, পেশাগত মানসিকতা—এমনকি ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কেও ধারণা তৈরি হতে পারে। নিয়োগ বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার আগে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রার্থীর প্রকাশ্য অনলাইন কার্যক্রমও যাচাই করে। তাই কয়েক বছর আগের একটি পোস্টও হঠাৎ সামনে এসে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে সমস্যার কারণ হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকা দরকার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে। ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, ই-মেইল, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা ট্রেড লাইসেন্সের ছবি পোস্ট করলে প্রতারণা বা পরিচয় চুরির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইভাবে রিয়েল-টাইম লোকেশন, নিয়মিত যাতায়াতের পথ কিংবা কখন বাড়িতে কেউ থাকবে না—এমন তথ্য অপরাধীদের হাতে পৌঁছে যেতে পারে।
ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রেও সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কারও ব্যক্তিগত মুহূর্ত বা অপ্রস্তুত অবস্থার ছবি অনুমতি ছাড়া পোস্ট করলে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আইনি জটিলতাও তৈরি হতে পারে। প্রেম, দাম্পত্য বা পারিবারিক বিরোধের তথ্য জনসমক্ষে আনা আরও ঝুঁকিপূর্ণ। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর সাবেক সঙ্গীর ছবি, অভিযোগ বা ব্যক্তিগত কথোপকথন প্রকাশ করলে ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তা আপনার বিচক্ষণতা ও গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন।
একই কারণে ব্যক্তিগত চ্যাট, ই-মেইল বা ইনবক্সের স্ক্রিনশট অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা উচিত নয়। কেউ ব্যক্তিগতভাবে কোনো কথা বললেই সেটি জনসমক্ষে ছড়িয়ে দেওয়ার অধিকার পাওয়া যায় না। এমন কাজ সহকর্মী ও পরিচিতদের আস্থা নষ্ট করতে পারে।
রাগ, ক্ষোভ ও হতাশার মুহূর্তে পোস্ট দেওয়াও বিপজ্জনক। রাগ কমলে পোস্ট মুছে ফেলা যায়, কিন্তু তার আগেই কেউ স্ক্রিনশট নিয়ে রাখতে পারেন। সহকর্মী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপমানজনক বক্তব্য কয়েক মিনিটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘদিনের পেশাগত সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আবার সামাজিকমাধ্যমে নিজেকে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত হতাশ বা নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ দ্বিধায় পড়তে পারে।
স্ট্যাটাস ও মন্তব্যে কুরুচিপূর্ণ, অমর্যাদাকর বা আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা কমায়। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিগত পরিচয়, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে বিদ্বেষপূর্ণ ও উসকানিমূলক মন্তব্য কর্মক্ষেত্রের জন্য ঝুঁকির বার্তা দিতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন বক্তব্য আইনি সমস্যাও তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক মত প্রকাশ নাগরিকের অধিকার। তবে যাচাইহীন তথ্য ছড়ানো, ভিন্নমতের মানুষকে অপমান করা কিংবা আক্রমণাত্মকভাবে কোনো মতাদর্শ প্রচার করলে সহনশীলতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। কর্মক্ষেত্রে ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের সহকর্মী, গ্রাহক ও অংশীদারের সঙ্গে পেশাদার সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হতে পারে।

সামাজিকমাধ্যমে নিজের অর্জন তুলে ধরতে গিয়েও সততা জরুরি। যে দক্ষতা নেই সেটি আছে বলে দাবি করা, সামান্য অভিজ্ঞতাকে বড় করে দেখানো বা অন্যের কাজ নিজের নামে প্রচার করলে চাকরির সাক্ষাৎকারেই অসত্য ধরা পড়তে পারে। তখন সিভিতে দেওয়া অন্য তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
চাকরি না পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করাও সুফল বয়ে আনে না। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দেওয়া আক্রমণাত্মক পোস্ট অন্য প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের কাছেও পৌঁছাতে পারে। এতে ভবিষ্যৎ চাকরির সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কর্মক্ষেত্রের অভ্যন্তরীণ আলোচনা, মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত, গ্রাহকের তথ্য, আর্থিক হিসাব, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা নতুন পণ্যের তথ্য ফেসবুকে প্রকাশ করা গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ হতে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, চাকরির চুক্তি বা গোপনীয়তার শর্ত লঙ্ঘিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নাম উল্লেখ না করে বস বা সহকর্মীদের নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট দিলেও অনেক সময় সংশ্লিষ্টরা বুঝতে পারেন, কাকে উদ্দেশ করে লেখা হয়েছে। একইভাবে সাবেক কর্মস্থল নিয়ে প্রতিশোধমূলক পোস্ট ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তার কাছে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে। তাঁরা ভাবতে পারেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ছাড়ার পরও আপনি অভ্যন্তরীণ তথ্য এভাবেই প্রকাশ করবেন।
কর্মঘণ্টায় ‘বোরিং জব’, ‘টক্সিক অফিস’ বা ‘কাজ করতে ভালো লাগে না’ ধরনের পোস্ট দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। আবার নিজের প্রতিষ্ঠানের পণ্য, গ্রাহক বা ব্র্যান্ডকে হেয় করে মিম-ট্রল শেয়ার করলে ব্যক্তিগত রসিকতাও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
সতর্ক থাকতে হবে স্বার্থের সংঘাত নিয়েও। নিজ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের পণ্য নিয়মিত প্রচার কিংবা নিজের প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে খারাপভাবে উপস্থাপন করলে আনুগত্য ও পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এসব সতর্কতার অর্থ মতপ্রকাশ বন্ধ করা নয়। রাজনৈতিক মত, সমালোচনা ও প্রতিবাদ প্রকাশ করা মানুষের অধিকার। তবে পোস্ট দেওয়ার আগে ভাবতে হবে—তথ্যটি সত্য কি না, ভাষা দায়িত্বশীল কি না, এতে কারও গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না এবং কয়েক বছর পর পোস্টটি সামনে এলেও আপনি তার দায়িত্ব নিতে পারবেন কি না।
একটি পোস্ট লিখতে হয়তো দুই মিনিট লাগে। কিন্তু তার স্ক্রিনশট ও ডিজিটাল রেকর্ডের প্রভাব থেকে যেতে পারে বছরের পর বছর। তাই ‘পোস্ট’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে আরেকবার ভাবাই হতে পারে সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬