Loading...

সুরক্ষায় দরকার স্থায়ী ব্যবস্থা
একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল হাতছাড়া হলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা, পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিজ্ঞাপনের আয় একসঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। অনিশ্চয়তা তৈরি হয় কর্মীদের বেতন নিয়েও। অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশের ঘটনায় ঝুঁকিতে পড়তে পারে সংবাদসূত্রের পরিচয়। বাংলাদেশের নিউ মিডিয়ার জন্য তাই সাইবার সুরক্ষা এখন প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।


একটি ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল হাতছাড়া হলে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা, পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিজ্ঞাপনের আয় একসঙ্গে ধাক্কা খেতে পারে। অনিশ্চয়তা তৈরি হয় কর্মীদের বেতন নিয়েও। অ্যাকাউন্টে অনুপ্রবেশের ঘটনায় ঝুঁকিতে পড়তে পারে সংবাদসূত্রের পরিচয়। বাংলাদেশের নিউ মিডিয়ার জন্য তাই সাইবার সুরক্ষা এখন প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন।
ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদের অভিজ্ঞতা এই সংকটের আর্থিক দিকটি সামনে আনে। তার প্রতিষ্ঠানের সামাজিক মাধ্যমের পেজে একাধিকবার স্ট্রাইক পড়েছে। তিনি বলেন, প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হলে দর্শক ও পাঠক ফিরিয়ে আনতে বড় সংগ্রাম করতে হয়। আয় একটি পর্যায়ে পৌঁছানোর পর এমন ধাক্কা পুরো রাজস্ব ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে নিরাপত্তাবিষয়ক জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তর্জাতিকভাবে দক্ষ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। ফেসবুক ও ইউটিউব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপরও জোর দিয়েছেন। তার বক্তব্যে ছোট প্রতিষ্ঠানের সীমিত সক্ষমতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
প্রতিকারের পথ ঠিক করতে প্রথমেই ঝুঁকির ধরন চিহ্নিত করা প্রয়োজন। পাসওয়ার্ড চুরি, অননুমোদিত প্রবেশ ও ক্ষতিকর সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে দরকার কারিগরি তদন্ত এবং অ্যাকাউন্ট পুনরুদ্ধার। প্ল্যাটফর্মের নীতিমালার কারণে স্ট্রাইক বা কনটেন্ট সরানো হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে হয়। সম্পাদকীয় যাচাই, কপিরাইট সম্পর্কে ধারণা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এখানে পরস্পরের পরিপূরক।

ইউটিউবের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা অনুযায়ী, কমিউনিটি গাইডলাইনসের সতর্কতা বা স্ট্রাইকের বিরুদ্ধে ছয় মাসের মধ্যে আপিল করা যায়। কোন নীতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এসেছে, তা আগে পর্যালোচনা করতে হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো তাই নোটিশ, সংশ্লিষ্ট কনটেন্ট এবং আপিলের তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। ইউটিউব জানিয়েছে, ভিডিও মুছে দিলেও স্ট্রাইক থেকে যায় এবং আবার আপিল করা যায় না।
প্রতিরোধের প্রাথমিক ধাপগুলো তুলনামূলক সহজ। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের নির্দেশনায় প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড এবং দুই ধাপের যাচাই চালুর পরামর্শ রয়েছে। এসএমএসের বদলে অথেনটিকেটর অ্যাপ এবং বেশি ঝুঁকিতে নিরাপত্তা চাবি ব্যবহারের কথা বলেছে সংস্থাটি। পাশাপাশি সন্দেহজনক বার্তা অন্য মাধ্যমে যাচাই এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা প্রয়োজন।
সংবাদকক্ষের ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন দরকার। কে পেজের মালিক, কে প্রশাসক এবং কার কতটুকু প্রবেশাধিকার, তার লিখিত তালিকা থাকতে হবে। কর্মী চলে গেলে তার প্রবেশাধিকার বাতিল করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণাধীন ইমেইল, নিরাপদে রাখা পুনরুদ্ধার কোড এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত অনুমতি একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ওপর পুরো কার্যক্রমের নির্ভরতা কমাতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল এলিয়ট তার প্রকাশিত ব্যাখ্যায় সাইবার নিরাপত্তাকে অন্যান্য ব্যবসায়িক ঝুঁকির সঙ্গে ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন তুলে ধরেছেন। সংস্থাটির সাইবারসিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্কে দায়িত্ব নির্ধারণ, ঝুঁকি শনাক্ত, সুরক্ষা, আক্রমণ শনাক্ত, সাড়া দেওয়া ও পুনরুদ্ধারকে একই ব্যবস্থার অংশ ধরা হয়েছে। ছোট সংবাদকক্ষও সক্ষমতা অনুযায়ী এই কাঠামো গ্রহণ করতে পারে।
এর বাস্তব প্রয়োগ হলো নিয়মিত ব্যাকআপ এবং সেই ব্যাকআপ থেকে তথ্য ফেরানো যায় কি না, পরীক্ষা করা। হামলার সময় কে সিদ্ধান্ত নেবেন, কে সহায়তা চাইবেন এবং পাঠককে কোথায় তথ্য জানানো হবে, তা আগেই ঠিক করা প্রয়োজন। সংবাদসূত্রের সংবেদনশীল তথ্যের জন্য আলাদা সুরক্ষা ও সীমিত প্রবেশাধিকার রাখতে হবে।
আন্তর্জাতিক সহায়তার একটি উদাহরণ অ্যাকসেস নাউয়ের ডিজিটাল সিকিউরিটি হেল্পলাইন। যোগ্য সাংবাদিক, গণমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনকে এটি বিনা খরচে সার্বক্ষণিক কারিগরি পরামর্শ এবং জরুরি সহায়তা দেয়। বাংলাদেশেও গণমাধ্যমগুলোর যৌথ সহায়তাকেন্দ্র গড়ে এই ধরনের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বয় করা যেতে পারে। সেখানে প্রযুক্তিবিদ ও আইনজীবীর সহায়তা এবং প্ল্যাটফর্মে অভিযোগ অনুসরণের ব্যবস্থা থাকবে। সদস্যদের চাঁদা ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় এমন কেন্দ্রের ব্যয় ভাগ করা গেলে ছোট সংবাদকক্ষগুলোও নিয়মিত সেবা নিতে পারবে।

দেশের ভেতরে বিডি ই-গভ সার্টের অনলাইন ব্যবস্থায় সাইবার ঘটনার বিবরণ ও প্রমাণ জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আক্রমণের সময়, লগ, সন্দেহজনক ইমেইল এবং ইতিমধ্যে নেওয়া পদক্ষেপ নথিবদ্ধ থাকলে সহায়তা চাওয়া সহজ হয়। যৌথ সহায়তাকেন্দ্র ছোট প্রতিষ্ঠানের হয়ে এসব তথ্য সাজানো, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের কাজও করতে পারে।
আইনি প্রতিকারের ক্ষেত্রেও হালনাগাদ ধারণা জরুরি। বাংলাদেশে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ১৮ ধারায় কম্পিউটার ও ডিজিটাল ব্যবস্থায় বেআইনি প্রবেশ এবং হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে তথ্য চুরি বা ক্ষতিসাধনের অপরাধ নির্ধারণ করা হয়েছে। আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রমাণ সংরক্ষণ করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ এবং পাশাপাশি কারিগরি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সুরক্ষার নীতিতে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান ১১ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা সংশোধনীতে অপরাধ, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের বিষয় একত্র করার ফলে অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানান। অংশীজনদের মতামতে খসড়া ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানায় সংস্থাটি। নীতি তৈরিতে গণমাধ্যম, প্রযুক্তিবিদ ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ তাই গুরুত্বপূর্ণ।
স্থায়ী সুরক্ষার সঙ্গে আয়ের পরিকল্পনাও যুক্ত। আন্তর্জাতিক মিডিয়া সাপোর্টের কাজের কাঠামোয় পাঠককে বোঝা, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানো এবং আয়ের উৎসে বৈচিত্র্য আনার ওপর গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের নতুন গণমাধ্যমের জন্য নিজস্ব ওয়েবসাইট, নিউজলেটার এবং পাঠকের সদস্যতা যোগাযোগের বিকল্প পথ হতে পারে। বিজ্ঞাপন, পাঠকের সহায়তা ও উপযুক্ত বাণিজ্যিক সেবার সমন্বয় একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর আর্থিক নির্ভরতা কমাবে।
এই পরিবর্তনে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ও পাঠকের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার নীতিও প্রয়োজন। পৃষ্ঠপোষকতার কনটেন্ট স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে; বিজ্ঞাপনদাতা বা সহায়তাকারীর প্রভাব থেকে সংবাদ নির্বাচন সুরক্ষিত রাখতে হবে। নিরাপত্তার জন্য নিয়মিত বাজেট, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মী এবং জরুরি তহবিল থাকলে আক্রমণের পর প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে অর্থ ও সহায়তা খুঁজতে হবে না।
সমাধানের কার্যকারিতা বোঝার মাপকাঠিও নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে দুই ধাপের যাচাই কতটা চালু, ব্যাকআপ কত নিয়মিত পরীক্ষা হয়, অভিযোগের উত্তর পেতে কত সময় লাগে এবং বন্ধ কার্যক্রম কত দ্রুত ফেরে। নিউ মিডিয়ার টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই ধারাবাহিক প্রস্তুতির ওপর—যা একই সঙ্গে সাংবাদিক, সংবাদসূত্র, পাঠক ও আয়কে সুরক্ষা দেবে।
নবোদয়/ এসএন/ জেডআরসি/ ০৪ অক্টোবর ২০২৬