Loading...

হাতির জন্য পথ ছেড়ে দেয় মানুষ
হাতি লোকালয়ে ঢুকে ফল খায়, গাছ ভাঙে, কখনো বাড়িঘর ও রান্নাঘরেরও ক্ষতি করে। এরপরও বরুণাছড়ির বাসিন্দারা হাতিকে আক্রমণ করেন না। নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রয়োজন হলে টর্চের আলো, টিন বা ধাতব বস্তু বাজিয়ে শব্দ তৈরি করে হাতিগুলোকে বনের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।


কাপ্তাই হ্রদের পানি আর চিরসবুজ পাহাড়ি বনের মধ্যে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায় এশীয় বন্য হাতি। কখনো পাহাড়ের ঢালে, আবার কখনো খাবারের সন্ধানে আমলকী, পেয়ারা, কলা ও লিচুবাগানে ঢুকে পড়ে তারা। রাঙামাটির বরকল উপজেলার বরুণাছড়িতে হাতির এই আসা-যাওয়া নতুন নয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে সেখানে ১০ থেকে ১২টি হাতির বিচরণ রয়েছে।
হাতি লোকালয়ে ঢুকে ফল খায়, গাছ ভাঙে, কখনো বাড়িঘর ও রান্নাঘরেরও ক্ষতি করে। এরপরও বরুণাছড়ির বাসিন্দারা হাতিকে আক্রমণ করেন না। নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। প্রয়োজন হলে টর্চের আলো, টিন বা ধাতব বস্তু বাজিয়ে শব্দ তৈরি করে হাতিগুলোকে বনের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন বেগমের আমলকী ও পেয়ারা গাছ ভেঙেছে হাতি। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাঁর পাকঘরও। কখনো বাড়ির দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেছে। তারপরও হাতিকে আক্রমণ করেননি তিনি। পারভীন জানান, বনে খাবারের সংকট দেখা দিলে হাতি লোকালয়ে আসে। তখন গ্রামের মানুষ রাত জেগে পাহারা দেন এবং সবাইকে সতর্ক রাখেন।
একই অভিজ্ঞতা স্থানীয় বাসিন্দা জাফর উদ্দিনের। তাঁর বাগানের ফল ও গাছপালা বিভিন্ন সময় হাতি নষ্ট করেছে। ক্ষতিপূরণের জন্য বন বিভাগে আবেদন করলেও এখনো অর্থ পাননি বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হাতি সরানোর ক্ষেত্রে নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করেন স্থানীয়রা।
বরকল ও লংগদু উপজেলার হাতির বিচরণ এলাকায় কাজ করছে এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম বা ইআরটি। হাতির অবস্থান সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা, সংঘাত এড়াতে পরামর্শ দেওয়া এবং লোকালয়ে ঢুকে পড়া হাতিকে নিরাপদে ফেরানো তাদের কাজ। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট রয়েছে দলগুলোর।
ইআরটি সদস্য মোহাম্মদ জহাঙ্গীর আলম বাবু বলেন, তাঁদের পর্যাপ্ত টর্চ, বাঁশি, বাদ্যযন্ত্র, ছাতা কিংবা নৌকা নেই। সীমিত সরঞ্জাম নিয়েই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হলে হাতি ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও কার্যকরভাবে কাজ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কেজি খাবার এবং অন্তত ১০০ লিটার পানি প্রয়োজন। বরুণাছড়ির পাহাড়ি বন ও কাপ্তাই হ্রদ সেই চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে। তবে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, আগুন ও মানুষের বসতি বাড়ার কারণে হাতির আবাসস্থল এবং চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। বনে পর্যাপ্ত খাবার না থাকলে কাছের ফলের বাগান তাদের সহজ খাদ্যের উৎস হয়ে ওঠে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রফিকুজ্জামান শাহ জানিয়েছেন, হাতিগুলো সব সময় একসঙ্গে থাকে না। কখনো তিনটি, চারটি বা ছয়টির দলেও বিচরণ করে। জরিপ ছাড়া সেখানে পুরুষ, নারী ও বাচ্চা হাতির সুনির্দিষ্ট সংখ্যা বলা সম্ভব নয়। হাতির নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
বন বিভাগের হিসাবে, চলতি বছর বন্য হাতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে বিধিমালা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। বরকল এলাকায় বন বিভাগের তিনটি এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমও কাজ করছে।
আইইউসিএনের ২০১৬ সালের জরিপে দেশে ২৬৮টি আবাসিক বন্য হাতি, ৯৩টি আন্তঃসীমান্তীয় হাতি ও ৯৬টি বন্দী হাতির তথ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এশীয় হাতি অতি বিপন্ন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ। আবাসস্থল সংকোচন, বনভূমিতে মানুষের কর্মকাণ্ড এবং মানুষ-হাতির সংঘাত প্রজাতিটির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।
হাতি সংরক্ষণে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। এর আওতায় হাতির খাদ্যোপযোগী বাগান ও বাঁশবাগান তৈরি, জলাধার খনন, বায়োফেন্সিং, ট্রি টাওয়ার, উদ্ধারকেন্দ্র এবং আহত হাতির চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুধু প্রকল্প দিয়ে মানুষ-হাতির সংঘাত বন্ধ করা সম্ভব নয়। আবাসস্থল ও চলাচলের পথ রক্ষার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং ইআরটি সদস্যদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিতে হবে। মানুষের সহনশীলতা সহাবস্থান সম্ভব করতে পারলেও সেটি টিকিয়ে রাখতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় সহায়তাও প্রয়োজন।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৫ অক্টোবর ২০২৬