Loading...

বাংলাদেশ–চীন বাণিজ্য ও যোগাযোগ
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে আমদানির তুলনায় রপ্তানি অনেক কম। এই ব্যবধান কমাতে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে ঢাকা। রবিবার ইউনানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে প্রদেশটির রাজধানী কুনমিং পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের প্রস্তাব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে সড়কটি কোথা দিয়ে যাবে, মিয়ানমার হয়ে নিয়মিত পণ্য চলাচল কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং এতে বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বাড়বে—এসবের হিসাব এখনো সামনে আসেনি।


চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে আমদানির তুলনায় রপ্তানি অনেক কম। এই ব্যবধান কমাতে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান প্রদেশকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছে ঢাকা। রবিবার ইউনানের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে প্রদেশটির রাজধানী কুনমিং পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের প্রস্তাব দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তবে সড়কটি কোথা দিয়ে যাবে, মিয়ানমার হয়ে নিয়মিত পণ্য চলাচল কীভাবে নিশ্চিত হবে এবং এতে বাংলাদেশের রপ্তানি কতটা বাড়বে—এসবের হিসাব এখনো সামনে আসেনি।
বাণিজ্যমন্ত্রীর হিসাবে, প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটারের কার্যকর সড়ক গড়ে উঠলে ২৪ ঘণ্টায় পণ্য পরিবহন সম্ভব হতে পারে। হিসাবটি ধরে গন্তব্যে পৌঁছাতে বিরতিসহ ঘণ্টায় গড়ে ৫০ কিলোমিটার চলতে হবে। এর মধ্যে পড়বে বাংলাদেশ–মিয়ানমার ও মিয়ানমার–চীন সীমান্তে কাগজপত্র পরীক্ষা, শুল্কপ্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য নিরাপত্তা যাচাই। গাড়ি, চালক বা পণ্যবাহী কনটেইনার বদলাতে হলে সময় আরও বাড়তে পারে। তাই ২৪ ঘণ্টা অসম্ভব বলা যাচ্ছে না; সেটিকে নিয়মিত পণ্য পরিবহনের নির্ভরযোগ্য সময়সীমা বলতে হলে পথভিত্তিক সমীক্ষা প্রয়োজন। রবিবারের বৈঠকের বিবরণে পূর্ণ পথের মানচিত্র, ব্যয় বা সীমান্ত পার হতে প্রয়োজনীয় সময়ের হিসাব দেওয়া হয়নি।

প্রস্তাবটির পেছনে কয়েক মাসের কূটনৈতিক আলোচনা আছে। জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ–মিয়ানমার–চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব দেয় বেইজিং। সফরের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ তখনো প্রস্তাবটি মূল্যায়ন করছে। সেপ্টেম্বরেও দুই দেশের কর্মকর্তারা করিডোর নিয়ে আলোচনা করেছেন। রবিবারের বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী সরাসরি সড়কপথের সম্ভাবনা তুলে ধরলেন; তবে আলোচনার অগ্রগতি আর সড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত এক পর্যায়ের বিষয় নয়।
এই পথ বাস্তবায়নে মিয়ানমারের ভূমিকা অপরিহার্য। ট্রানজিটের শর্ত, সীমান্ত দিয়ে ট্রাক চলাচল, পণ্যের নিরাপত্তা এবং অবকাঠামো নির্মাণে তিন দেশের সমন্বয় লাগবে। চীন ও মিয়ানমার জুনে নিজেদের অর্থনৈতিক করিডোরের কয়েকটি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু রবিবারের বাংলাদেশ–ইউনান বৈঠকের বিবরণে প্রস্তাবিত বাংলাদেশমুখী সড়ক নিয়ে মিয়ানমারের সম্মতি বা ত্রিপক্ষীয় ব্যবস্থার তথ্য নেই।
নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বর্তমান বাস্তবতা। জাতিসংঘের একটি তদন্ত সংস্থা ২৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশ্বব্যাংকও দেশটির সংঘাতকে বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থার ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রস্তাবিত সড়ক ঠিক কোন পথ নেবে, তা নির্ধারিত না হওয়ায় এই ঝুঁকির পরিমাণ নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে পথ যত ছোটই হোক, সংঘাতের কারণে চলাচল অনিশ্চিত হলে পণ্য সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা ও খরচ—দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।

সড়ক চালু হলে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলার; বিপরীতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। চীন থেকে বাংলাদেশ মূলত যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। ফলে পরিবহন সহজ হলে বাংলাদেশি পণ্যের পাশাপাশি চীনা পণ্যের আমদানিও সুবিধা পেতে পারে। সস্তায় কাঁচামাল পাওয়া উৎপাদনকারীর লাভ হতে পারে, কিন্তু তাতে ঘাটতি কমার নিশ্চয়তা তৈরি হয় না।
বৈঠকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও ইউনানের মোট বাণিজ্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়েছে। কিন্তু এই অঙ্কের কতটা বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি, তা প্রকাশিত বিবরণে নেই। ইউনানের সঙ্গে এক পঞ্জিকাবর্ষের মোট বাণিজ্য এবং পুরো চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের এক অর্থবছরের ঘাটতিও সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়। ঘাটতি কমার সম্ভাবনা বুঝতে ইউনানে বাংলাদেশের পণ্যভিত্তিক রপ্তানি, আমদানি ও ক্রয়াদেশের তথ্য দরকার।
বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ইউনানে বন্ডেড গুদাম ও প্রদর্শনীকেন্দ্র চালুর উদ্যোগ রয়েছে। চীন বাংলাদেশকে সব শুল্কসারিতে শূন্য শুল্কের সুবিধা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। তবু শুল্কসুবিধা একাই বিক্রি নিশ্চিত করে না। কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রে অনুমোদিত খামার, প্যাকেটজাতকরণ ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা মেনে চলতে হয়—বাংলাদেশি কাঁঠাল আমদানির বিষয়ে চীনের প্রকাশিত নিয়মেই এসব শর্ত রয়েছে।
চট্টগ্রাম–কুনমিং সড়ক তাই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার পাশাপাশি তিনটি যাচাইয়ের প্রশ্ন সামনে এনেছে—২৪ ঘণ্টার সময় ও পরিবহন ব্যয়ের হিসাব কী, মিয়ানমার হয়ে পথটি কতটা নিরাপদ ও নিয়মিত থাকবে, আর ইউনানে বাংলাদেশের রপ্তানি বাস্তবে কত বাড়তে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তরেই বোঝা যাবে প্রস্তাবটি বাণিজ্যের নতুন পথ খুলবে কি না।
নবোদয়/ এসএন/ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬