Loading...

পাকিস্তানে বোমা হামলায় নিহত ১১
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া আবারও রক্তাক্ত। আফগানিস্তান সীমান্তঘেঁষা এই প্রদেশে কখনো পুলিশ চৌকি, কখনো সেনা বহর, কখনো মসজিদ কিংবা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে প্রায় নিয়মিত হামলা হচ্ছে। পাল্টা অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক জঙ্গি হত্যার দাবি করছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।


পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া আবারও রক্তাক্ত। আফগানিস্তান সীমান্তঘেঁষা এই প্রদেশে কখনো পুলিশ চৌকি, কখনো সেনা বহর, কখনো মসজিদ কিংবা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে প্রায় নিয়মিত হামলা হচ্ছে। পাল্টা অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক জঙ্গি হত্যার দাবি করছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু হামলার গতি থামছে না। বরং সেপ্টেম্বরেই কয়েক দিনের ব্যবধানে বড় দুটি হামলা দেখিয়ে দিল, বহু বছরের সামরিক অভিযান সত্ত্বেও অঞ্চলটির নিরাপত্তা সংকট কতটা গভীর।
সর্বশেষ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান সীমান্তের কাছে দেরা ইসমাইল খান জেলার মুঘল কোট ও দারাজিন্দার নিকটবর্তী আমান মেলা পুলিশ চেকপোস্টে বোমা হামলায় অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটজন পুরুষ, দুই নারী ও একটি শিশু। পুলিশ ও কাস্টমস সদস্যসহ আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। তবে হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সংগঠন স্বীকার করেনি।
মাত্র আট দিন আগেই, ১৮ সেপ্টেম্বর, একই প্রদেশের কোহাটে ওল্ড পুলিশ লাইন্সের একটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় বিস্ফোরকবোঝাই গাড়ি নিয়ে হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের পর সশস্ত্র হামলাকারীরা পুলিশ কমপ্লেক্সে ঢোকার চেষ্টা করে। পরদিন পর্যন্ত চলা অভিযানের পর পাকিস্তানি পুলিশ ও কাউন্টার টেররিজম ডিপার্টমেন্ট ২৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে; নিহতদের ১৭ জন পুলিশ সদস্য ও ছয়জন বেসামরিক নাগরিক। আট হামলাকারীও নিহত হয়।
ইত্তেহাদুল মুজাহিদিন নামের একটি গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটি পাকিস্তানি তালেবান বা তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-সংশ্লিষ্ট হাফিজ গুল বাহাদুর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত বলে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চলতি বছরে খাইবার পাখতুনখোয়ায় সহিংসতার মাত্রা কতটা বেড়েছে, তার বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার শুক্রবার দাবি করেন, ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত প্রদেশটিতে ২ হাজার ৪৫৬টি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হয়েছে। এসব ঘটনায় পুলিশ, সেনাবাহিনী, রেঞ্জার্স ও ফ্রন্টিয়ার কোরের ৪৭২ সদস্য নিহত এবং দেড় হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। তবে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খাইবার পাখতুনখোয়া সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে এই পরিসংখ্যান দিয়েছেন।
স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের হিসাবের পদ্ধতিও আলাদা। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (CRSS) হিসাবে বছরের প্রথম তিন মাসে খাইবার পাখতুনখোয়ায় সন্ত্রাসী হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা অভিযান মিলিয়ে ৩১১ জন নিহত হন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪৭৫ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ বছরের প্রথম ছয় মাসেই অঞ্চলটিতে ৭৮৬টি ‘সহিংসতাসংশ্লিষ্ট মৃত্যু’ নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি। এতে বেসামরিক মানুষ, নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র যোদ্ধা সবাই অন্তর্ভুক্ত।
জুলাই ও আগস্টেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (PICSS) হিসাবে জুলাইয়ে মূল খাইবার পাখতুনখোয়া ও সাবেক উপজাতীয় জেলাগুলো মিলিয়ে ২৩৩ জন এবং আগস্টে ১৭১ জন সংঘাতসংশ্লিষ্ট ঘটনায় নিহত হন। সংস্থাটির হিসাবে শুধু আগস্টেই এই দুই অঞ্চলে জঙ্গিরা ১০৬টি হামলা চালায়।
কেন একই অঞ্চল বারবার পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের কেন্দ্রে?
প্রথম কারণ ভৌগোলিক। আফগানিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘ ও দুর্গম সীমান্ত, পাহাড়ি এলাকা এবং ঐতিহাসিক ডুরান্ড লাইনের দুই পাশে পশতুন জনগোষ্ঠীর বসবাস জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর চলাচল, আশ্রয় ও নেটওয়ার্ক তৈরির সুযোগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান, বান্নু, ট্যাঙ্ক, লাক্কি মারওয়াত ও দেরা ইসমাইল খান দীর্ঘদিন ধরেই হামলার কেন্দ্র।

দ্বিতীয় বড় পরিবর্তন আসে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর। টিটিপি ও আফগান তালেবান পৃথক সংগঠন হলেও তাদের আদর্শিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণাতেও বলা হয়েছে, তালেবানের ক্ষমতায় ফেরা টিটিপিকে নতুন করে সংগঠিত ও সাহসী হতে সহায়তা করেছে; ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৪১টি ছোট জঙ্গি গোষ্ঠী আবার টিটিপির সঙ্গে যুক্ত হয়।
ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করছে, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপি আশ্রয় পাচ্ছে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে হামলা চালাচ্ছে। কাবুলের তালেবান সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এই বিরোধ এখন সীমান্তের দুই পাশের সরাসরি সামরিক উত্তেজনায়ও রূপ নিয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান আফগান সীমান্ত এলাকায় বিমান হামলা চালিয়ে ২৮ জঙ্গি হত্যার দাবি করে; আফগান কর্তৃপক্ষ ওই হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগ তোলে।
তৃতীয় সমস্যা রাষ্ট্রীয় শাসনের দুর্বলতা। সাবেক ফেডারেল অ্যাডমিনিস্টার্ড ট্রাইবাল এরিয়াগুলো ২০১৮ সালে খাইবার পাখতুনখোয়ার সঙ্গে একীভূত হলেও এসব এলাকায় কার্যকর প্রশাসন, পুলিশ, আদালত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। গবেষকেরা বলছেন, দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বল সরকারি উপস্থিতি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে স্থানীয় নেটওয়ার্ক ধরে রাখার সুযোগ দেয়।
সামরিক অভিযানে টিটিপি ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলো বারবার বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। কিন্তু খাইবার পাখতুনখোয়ার সংকট দেখাচ্ছে, শুধু কত জঙ্গি নিহত হলো সেই হিসাব দিয়ে সমস্যার শেষ মাপা যাচ্ছে না। শনিবার আমান মেলার চেকপোস্টে নারী ও শিশুসহ ১১ জনের মৃত্যু সেই পুরোনো বাস্তবতাকেই আবার সামনে এনেছে। সীমান্তের ওপারের আশ্রয়, ভেতরের দুর্বল শাসন এবং পুনর্গঠিত জঙ্গি নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে একটি অভিযান শেষ হলেও পরবর্তী হামলার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
নবোদয়/ এসএন/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬