Loading...

ঠেলে দেওয়া হয়েছে ২,৩৬৯ জনকে
রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক মাসের মধ্যেই মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় স্কুলছাত্রী স্বর্ণা দাস। তার মরদেহ ফেরত দেওয়া হয় ৪৫ ঘণ্টা পর। মাত্র আট দিন পর ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তে কিশোর জয়ন্ত কুমার সিংহ নিহত এবং আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন।


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যা, নির্যাতন, পুশ-ইন এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মুখোমুখি অবস্থানের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গেল দুই বছর ধরে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবস্থায় রয়েছে। ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের বিভিন্ন অংশে প্রাণহানি ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক মাসের মধ্যেই মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় স্কুলছাত্রী স্বর্ণা দাস। তার মরদেহ ফেরত দেওয়া হয় ৪৫ ঘণ্টা পর। মাত্র আট দিন পর ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তে কিশোর জয়ন্ত কুমার সিংহ নিহত এবং আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। একই বছরের অক্টোবরে কুমিল্লা সীমান্তে কামাল হোসেন ও ডিসেম্বরে পঞ্চগড়ে আনোয়ার হোসেন নিহত হন। বছরের শেষ দিকে সিলেটের জৈন্তাপুর সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়া নাগরিকদের গুলিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
বিএসএফ ১৪ বাংলাদেশিকে আটক বা ধরে নিয়ে যায়; তাদের মধ্যে চারজনকে ফেরত দেওয়া হয়। একই সময়ে ভারতীয় নাগরিকদের, প্রধানত খাসিয়াদের হাতে আরও অন্তত ১২ বাংলাদেশি নিহত হন।
২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিএসএফ-সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় আরও ১২ বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের নয়জন গুলিতে এবং তিনজন নির্যাতনে মারা যান। আহত হন ১১ জন এবং আটক হন তিনজন। সেপ্টেম্বরে ঠাকুরগাঁও সীমান্তে আসাদুল হকের মৃত্যুসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা অন্তত ৫৮।
হত্যার পাশাপাশি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ ঘিরে বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও লালমনিরহাটের দহগ্রামসহ পাঁচটি স্থানে বিএসএফের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয় বিজিবি। বাংলাদেশের অভিযোগ ছিল, যৌথ সমন্বয় ছাড়াই শূন্যরেখার ১৫০ গজের মধ্যে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছিল।

এ ঘটনায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে ঢাকা। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের কূটনীতিককে তলব করে নয়াদিল্লি। ১৮ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিরণগঞ্জ সীমান্তে গাছের ডাল কাটা নিয়ে দুই দেশের বাসিন্দাদের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হন। ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগও ওঠে।
পুশ-ইনের বড় ঢেউ শুরু হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। বিজিবির হিসাবে, ৭ ও ৮ মে রাতেই দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ২০২ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। ৯ মে পর্যন্ত সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২৮০ জনে। খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল এবং সুন্দরবনের মান্দারবাড়িয়ার মতো দুর্গম পথ ব্যবহার করা হয়। আসা ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশির পাশাপাশি ভারতীয় নাগরিক ও রোহিঙ্গা থাকার তথ্যও পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের ১৭ জুন সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২ হাজার ৩৬৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে বিএসএফ। তাদের মধ্যে ২ হাজার ১৭৫ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়, ১১ জনকে বিএসএফের কাছে ফেরত এবং ১৮৩ জনকে ভারতে পাঠানো হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে ভারত, তাদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও ছিলেন। ভারতের বক্তব্য, অবৈধভাবে অবস্থানকারীদের আইন অনুযায়ী ফেরত পাঠানো হচ্ছে এবং ২০২০ সাল থেকে ২ হাজার ৩৬৯ সন্দেহভাজন বাংলাদেশির নাগরিকত্ব যাচাই ঝুলে রয়েছে। বাংলাদেশ বলছে, পরিচয় নিশ্চিত হলে নির্ধারিত কনস্যুলার প্রক্রিয়ায় নিজের নাগরিকদের গ্রহণ করা হবে। একতরফা পুশ-ইন গ্রহণযোগ্য নয়।
চলতি বছরও পুশ-ইনের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জুনের এক দিনেই সাত জেলার সীমান্ত দিয়ে প্রায় ৯০ জনকে পাঠানোর ১০টি চেষ্টা ঠেকায় বিজিবি। সেপ্টেম্বরে দিনাজপুর সীমান্তে ৬০ থেকে ৭০ জনকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হয়।
সর্বশেষ ৭ অক্টোবর পঞ্চগড়ের বোদা সীমান্ত দিয়ে সাতজনকে পাঠানোর চেষ্টা প্রতিহত করেছে বিজিবি। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানো ও বৈধ প্রক্রিয়ায় প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি দুই পক্ষ বারবার দিলেও হত্যা, পুশ-ইন ও উত্তেজনার ঘটনা বন্ধ হয়নি।
নবোদয়/ এআরজে/ জেডআরসি/ ০৭ অক্টোবর ২০২৬